উত্তরাঞ্চলে আলু তোলার মৌসুম শুরু হতেই বাজারে দামের তীব্র পতন দেখা দিয়েছে। উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। ফলে লাভের বদলে লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে তাদের। বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
উৎপাদন খরচের নিচে বাজারদর
রোববার রংপুর নগরীর বাজারগুলোতে আলু খুচরা বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকায়। অথচ কৃষকদের হিসাবে আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ পড়ছে প্রায় ১৪ থেকে ২২ টাকা। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কেজিতে গড়ে ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। পাইকারি বাজারেও দাম খুব একটা বাড়েনি, সেখানে আলুর দাম ঘুরছে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ১৭ টাকার মধ্যে।

উৎপাদনের বড় অংশ উত্তরাঞ্চলেই
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেড়েছে উৎপাদন খরচ
রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও পাবনার মতো বড় উৎপাদন অঞ্চলের কৃষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এবার বীজ, সার, সেচ ও শ্রমের খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ গড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ থেকে ২২ টাকার মধ্যে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষক সুজন রহমান জানান, গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার আলু চাষ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাজারদর এতটাই কম যে খরচও তুলতে পারছেন না।
কাউনিয়া উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরুতে আগাম আলু রোপণের উদ্দেশ্য থাকে বেশি দাম পাওয়া। কিন্তু গত বছরের অবিক্রিত আলু এখনও বাজারে থাকায় নতুন আলুর চাহিদা কমে গেছে।

লোকসানের মুখে বড় চাষিরাও
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক হাসিম মিয়া জানান, তিনি ১৮ বিঘা জমিতে কার্ডিনাল জাতের আলু চাষ করেছেন। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ২২ টাকা। কিন্তু এখন বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৮ টাকায়। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
দাম কমার পেছনে নানা কারণ
কৃষকদের মতে, আগের মৌসুমের অবিক্রিত আলুর মজুত, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাব বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে। অনেকের অভিযোগ, বাজারে প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত উৎপাদনও দামের পতনে ভূমিকা রাখছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির সুযোগ সীমিত এবং সংরক্ষণের ব্যয় বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় পরিমাণে আলু কিনতে আগ্রহী নন। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দাম ক্রমেই নিচে নামছে।

সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
রংপুর বিভাগের কৃষি বিপণন বিভাগের উপপরিচালক শাহিন মিয়া জানান, গত বছরের তুলনায় এবার আলু চাষ কিছুটা কম হয়েছে, যা মৌসুমের পরবর্তী সময়ে বাজার স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এ বছর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আলু চাষ হয়েছে, যার ফলে সরবরাহ বেড়ে গেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আলুর জন্য নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করা এবং কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের লোকসান থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে। তারা কৃষকবান্ধব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















