বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শুরুতেই মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা বেড়েছে। মাছ, ফল ও সবজির দাম বাড়ায় খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও চালের দাম কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলেছে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক ফেব্রুয়ারি ২০২৬’-এ এ তথ্য জানিয়েছে।
জিইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ খাদ্যপণ্যের দামের চাপে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আবারও কিছুটা বেড়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে
জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। তবে একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৮১ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ডিসেম্বরে তা ছিল ৯.১৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে খাদ্যপণ্য। জানুয়ারিতে মোট মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪৩.০৬ শতাংশ এসেছে খাদ্যদ্রব্য থেকে, যা ডিসেম্বরে ছিল প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ ছাড়া আবাসন ও ইউটিলিটি খাতের অবদান ছিল ১৫.০৫ শতাংশ এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবার অবদান ছিল ৯.৩১ শতাংশ।

চালের দামের চাপ কমেছে
খাদ্যপণ্যের তালিকায় চালের দাম কিছুটা কমার ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান নেমে এসেছে ২২.১৬ শতাংশে, যেখানে ডিসেম্বরে তা ছিল ৩৭.৩৪ শতাংশ।
চালের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও কমে জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৭.৬১ শতাংশে। ডিসেম্বরে এটি ছিল ১১.৯২ শতাংশ। মাঝারি, মোটা ও চিকন—সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধির হার কমেছে।
তবে চালের দাম কমলেও সবজি, ফল ও মাছের দাম বাড়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ অবস্থায় রয়েছে।

সবজি ও মাছের দামে নতুন চাপ
ডিসেম্বরে সবজির দাম মূল্যস্ফীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও জানুয়ারিতে তা ইতিবাচক অবদান রাখতে শুরু করেছে। মাছ ও শুকনা মাছও খাদ্য মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জিইডি জানিয়েছে, সবজির দাম বাড়ার পেছনে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পাইকারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

মূল্যস্ফীতি ও মজুরির ব্যবধান বাড়ছে
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় স্থির রয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।
জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৮ শতাংশ, অথচ মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে এই হার ছিল ৮.০৭ শতাংশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে।
জিইডি মনে করছে, এর ফলে বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, কারণ তাদের ব্যয়ের বড় অংশই প্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়।
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি
জানুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা।
আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, অভ্যন্তরীণ ভ্যাট, আয়কর ও ভ্রমণ কর—সব প্রধান খাতেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা গেছে।
তবে ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে রাজস্ব আদায় সামান্য বেড়েছে। ডিসেম্বরে আদায় হয়েছিল ৩৬ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা জানুয়ারিতে বেড়ে হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২.৩ শতাংশ।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৩.৮১ শতাংশ।

এডিপি বাস্তবায়ন ধীরগতিতে
চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নও প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট বরাদ্দের মধ্যে ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ২১.১৮ শতাংশ। সাধারণত অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এই হার ৫০ থেকে ৫৮ শতাংশ হওয়ার কথা।
শুধু জানুয়ারি মাসেই ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিকভাবে বাস্তবায়নের গতি এখনো কম।
জিইডি সতর্ক করেছে, বাকি সময়ে ব্যয় বাড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম হতে পারে। এতে অবকাঠামো প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়তে পারে।
প্রকল্প প্রস্তুতির দুর্বলতা, ক্রয় প্রক্রিয়ার দেরি, জমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং সমন্বয় সমস্যাকে ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদেশি খাতে স্থিতিশীলতা
দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপে থাকলেও বৈদেশিক খাতে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৩.১৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ২.১৯ বিলিয়ন ডলার।
রমজানকে কেন্দ্র করে মৌসুমি প্রবণতার কারণে প্রবাসী আয় আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছে জিইডি।
রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি
পণ্যের রপ্তানিতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার বড় অংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। ডিসেম্বর মাসে যেখানে তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল ৩.২৩ বিলিয়ন ডলার, জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৩.৬১ বিলিয়ন ডলার।
তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানিও সামান্য বেড়ে জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে ৭৯৮.৯ মিলিয়ন ডলারে।
তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো খুব শক্তিশালী অবস্থায় নেই।

অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার আশা
জিইডি আশা প্রকাশ করেছে, নতুন সরকার বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করবে।
একই সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, ঋণের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া সরকারের পরিকল্পিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু হলে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সহায়তা পাবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















