সাম্প্রতিক শীত মৌসুমে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন—ফ্লুতে আক্রান্ত মানুষের কথা বেশি শোনা যাচ্ছে, কিন্তু কোভিড নিয়ে তত আলোচনা নেই। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত ধারণা নয়। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালীন সময়ে ফ্লুর প্রকোপ বেশ তীব্র হয়েছে, আর কোভিড তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
কোভিড মহামারির শুরুতে করোনাভাইরাস ছিল অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী। ২০২০-২০২১ সালের প্রথম মহামারির শীতে প্রায় ফ্লু দেখা যায়নি বললেই চলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন সার্স-কোভ-২ আর নতুন ভাইরাস নয়; মানুষের শরীরে এর বিরুদ্ধে কিছুটা প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে কোভিড ও ফ্লুর উপসর্গ ও বিস্তার এখন অনেক ক্ষেত্রেই কাছাকাছি মনে হচ্ছে।
তবে একটি বড় পার্থক্য এখনো রয়েছে। করোনাভাইরাস সারা বছর ঘুরে বেড়ায় এবং গ্রীষ্মে এর প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়, যখন সাধারণত ফ্লু থাকে না। এতে প্রশ্ন উঠছে—তাহলে কি শীতের প্রধান রোগ হয়ে উঠছে ফ্লু আর গ্রীষ্মে বাড়ছে কোভিড? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এত সহজ নয়।
কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের শীর্ষ জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা মানিশা জুথানি বলেন, ভবিষ্যতে কোভিডের গতিপথ কী হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আগামী মৌসুমগুলো কেমন হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফ্লু ও কোভিড—দুটির ক্ষেত্রেই টিকা এখনো মানুষের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম শ্যাফনার বলেন, শ্বাসযন্ত্রের ভাইরাসগুলোর উত্থান-পতনে সব সময়ই ভিন্নতা দেখা যায়। সব ভাইরাস একরকম প্রভাব ফেলে না। কিন্তু রোগীর জন্য বিষয়টি এক—যে ভাইরাসই হোক, যদি হাসপাতালে যেতে হয়, সেটাই বড় বিপদ।
এই মৌসুমে সংক্রমণের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে কোভিডের ক্ষেত্রে গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৩০ লাখ থেকে ৯০ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ এবং মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষের।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, হাসপাতালের পরিসংখ্যান সব বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে না। অধিকাংশ মানুষই এসব ভাইরাসে হালকা উপসর্গে আক্রান্ত হয় বা কয়েকদিন অসুস্থ থেকে বাড়িতেই সুস্থ হয়ে যায়।
নর্দমার পানিতে ভাইরাসের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে যে তথ্য পাওয়া যায়, সেখানেও দেখা গেছে ফ্লুর প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর কোভিডে সামান্য বৃদ্ধি হয়েছে—যা গ্রীষ্মের ঢেউয়ের তুলনায় কম।
এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং ওয়েস্টওয়াটারস্ক্যান কর্মসূচির পরিচালক মার্লিন উলফ বলেন, গ্রীষ্মকালে শ্বাসযন্ত্রের রোগের আলোচনায় কোভিডই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। কিন্তু শীতে পরিস্থিতি জটিল হয়, কারণ ফ্লু ও কোভিড দুটিই প্রায় একই সময়ে বাড়তে পারে। এতে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়ে এবং একসঙ্গে দুই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়, যা রোগীকে আরও গুরুতর অসুস্থ করে তুলতে পারে।
গত বছরের ফ্লু মৌসুমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫ কোটি ১০ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়েছিল, ৭ লাখ ১০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং প্রায় ৪৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ শিশু ছিল—যা ২০০৯ সালের পর শিশু মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে কোভিডে মারা যায় প্রায় ১৯ হাজার মানুষ।
ফ্লু কেন বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে
গত দুই মৌসুমে ফ্লুর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ অস্বাভাবিক ভাইরাস স্ট্রেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা এ-এর এইচ৩এন২ নামে একটি স্ট্রেন সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর এই স্ট্রেনটিতে পরিবর্তন ঘটে, যা টিকা তৈরির সময় নির্ধারিত লক্ষ্য থেকে ভিন্ন হয়ে যায়।
ফলে বার্ষিক ফ্লু টিকা প্রত্যাশিত মাত্রায় সুরক্ষা দিতে পারেনি—যা গত বছরও দেখা গিয়েছিল।
উইলিয়াম শ্যাফনার বলেন, এই পরিবর্তনই মূলত টানা দুই বছর বড় ফ্লু মৌসুমের প্রধান কারণ, যা খুবই অস্বাভাবিক।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা এখনই বলতে চাইছেন না যে ভবিষ্যতেও শীতে কোভিডের চেয়ে ফ্লুই বেশি প্রভাব ফেলবে। কারণ দুই ভাইরাসের ক্ষেত্রেই প্রতিরোধক্ষমতা ও স্ট্রেন সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে।
কোভিডের পরিবর্তিত চেহারা
কোভিড ভাইরাস মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে গেলে নিজেকে পরিবর্তন করতেই হয়। তবে গত দুই বছরে এমন বড় কোনো রূপান্তর দেখা যায়নি, যা মানুষের বিদ্যমান প্রতিরোধক্ষমতাকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিতে পারে।
গত দুই শীত মৌসুমে টিকার জন্য যে ভাইরাস ভ্যারিয়েন্ট নির্বাচন করা হয়েছিল, তা বাস্তবে ঘুরে বেড়ানো ভ্যারিয়েন্টের সঙ্গে বেশ মিল ছিল।
মার্কিন গবেষক জিয়াদ আল-আলি বলেন, যদি ২০২০ সালে কোভিডকে জার্মান শেফার্ড কুকুরের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে এখন সেটি অনেকটা চিহুয়াহুয়ার মতো।
তার মতে, ২০২০ সালের পর করোনাভাইরাসে যেসব পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে ফুসফুসে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করা এবং গুরুতর ক্ষতি করার ক্ষমতা কিছুটা কমেছে।
মাউন্ট সিনাইয়ের আইকান মেডিকেল স্কুলের ভাইরোলজিস্ট ফ্লোরিয়ান ক্রামার বলেন, মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে আরও চার ধরনের করোনাভাইরাস দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেগুলোও কখনো গুরুতর হতে পারে, তবে সাধারণত সার্স-কোভ-২ এর মতো এত ক্ষতি করে না। গবেষকদের আশা, সময়ের সঙ্গে সার্স-কোভ-২ও হয়তো একইভাবে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর ভাইরাসে পরিণত হবে।
মানুষের প্রতিরোধক্ষমতার পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসের পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের শরীরেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে। এখন প্রায় সবাই কখনো না কখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বা টিকা নিয়েছে। ফলে শরীর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে টিকাদানের হার কমে যেতে পারে, বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে—যারা গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সর্বশেষ কোভিড টিকা নিয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। অন্যদিকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বয়স্ক মানুষ ফ্লুর টিকা নিয়েছেন, যা প্রায় গত বছরের মতোই রয়েছে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য স্কুলের মহামারি বিশেষজ্ঞ জেনিফার নুজ্জো বলেন, ভবিষ্যতে আবারও বড় কোভিড ঢেউ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নতুন শিশু জন্ম নিচ্ছে যারা টিকা পায়নি, ঝুঁকিপূর্ণ অনেক মানুষ সময়মতো টিকা নিচ্ছে না এবং ভাইরাসের পরিবর্তনও অব্যাহত রয়েছে।
তার ভাষায়, কোভিড আবার বাড়তে পারে। তবে ২০২০ সালের মতো পরিস্থিতি ফিরতে হলে ভাইরাসকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

কোনটি বেশি বিপজ্জনক
মহামারির শুরুতে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা প্রায়ই বলতেন, কোভিডকে সাধারণ ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করা ভুল। এখন স্বাস্থ্য বার্তায় এই দুটি রোগকে অনেক সময় একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স হাসপাতালের লক্ষ লক্ষ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে কোভিডে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হার এতটাই কমে যায় যে তা প্রথমবারের মতো ফ্লুর চেয়েও নিচে নেমে আসে।
ডেনমার্কের বিস্তৃত স্বাস্থ্যতথ্য বিশ্লেষণেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। একসময় কোভিডে মৃত্যুঝুঁকি ফ্লুর তুলনায় অনেক বেশি ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই রোগের মৃত্যুহার অনেকটা কাছাকাছি হয়ে এসেছে।
গবেষকদের ধারণা, কোভিডের ক্ষেত্রে কোষীয় প্রতিরোধক্ষমতা উন্নত হওয়া এবং ফ্লুর ক্ষেত্রে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতা—এই দুই কারণই এর ব্যাখ্যা হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ফ্লু ও কোভিডের ঝুঁকি কাছাকাছি হওয়া মানেই পরিস্থিতি নিরাপদ হয়ে গেছে—এমন নয়। ফ্লুও একটি বিপজ্জনক রোগ।
জিয়াদ আল-আলি বলেন, কোভিডকে অবহেলা করা ঠিক হবে না। ফ্লু সাধারণত শ্বাসযন্ত্রে সীমাবদ্ধ থাকলেও কোভিড হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বা লং কোভিড এখন কম দেখা গেলেও এটি এখনো ফ্লুর তুলনায় আলাদা একটি বড় সমস্যা।
তার গবেষণায় দেখা গেছে, মহামারির আগে ফ্লুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তুলনায় কোভিডে আক্রান্ত রোগীরা ১৮ মাস পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বা মৃত্যুঝুঁকিতে বেশি ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ফ্লু ও কোভিডের অবস্থান বদলানোর পর ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কীভাবে বদলাবে, তা জানতে আরও সময় লাগবে।
আল-আলি বলেন, যদি শুধু দৈনিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝা যায় না। দৃশ্যমান তথ্যের নিচে আরও বড় বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















