মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের শুরুতেই বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া। কারণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে, যা ইউক্রেনের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটে ইউক্রেন
ইরানকে ঘিরে সামরিক অভিযান শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদনে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ফলে ইউক্রেনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে যায়। একই সঙ্গে ইউরোপের মিত্র দেশগুলোকেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে রাশিয়া ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করছে তারা।
ইরানের হামলায় দ্রুত কমছে মজুত
যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো শত শত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি হামলা একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে মাত্র কয়েক দিনের মতো প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট থাকতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য সামরিক মজুত থেকেও অস্ত্র সরিয়ে নিতে হতে পারে, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তাদের সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজারো ড্রোন
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের তথ্য অনুযায়ী, অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান পাঁচ শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় দুই হাজার ড্রোন ছুড়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই অভিযানের জন্য তাদের কাছে পর্যাপ্ত সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে।
উৎপাদন সীমিত, প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল
প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে উন্নত সংস্করণ পিএসি–৩ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সীমিত। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ছিল ছয় শতাধিকের কিছু বেশি।
একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সাধারণত অন্তত দুটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দুইটি সফল না হলে তৃতীয় বা তারও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে এবং এর দামও কয়েক মিলিয়ন ডলারের সমান।
ইউক্রেনের জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তাদের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। তিনি ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছেন, ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে ইউক্রেনের জন্য নির্ধারিত সরবরাহ আরও কমে যাবে কি না।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই এখন সবচেয়ে বড় হুমকি। এই হামলা ঠেকানোর কার্যকর উপায় হিসেবে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৮০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম। ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার হামলার গতি সামাল দিতে প্রতি মাসে অন্তত ৬০টি পিএসি–৩ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















