মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বহুদিন ধরেই আশঙ্কা করছিল ইরানকে ঘিরে একটি বড় যুদ্ধের সম্ভাবনা। সেই আশঙ্কাই এখন বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় সামরিক আক্রমণের পর ইরান পাল্টা হামলা শুরু করায় পুরো অঞ্চল নতুন সংকটে পড়েছে। যুদ্ধের আগুনে সরাসরি জড়িয়ে না পড়েও উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিপজ্জনক কৌশলগত চাপে আটকে গেছে।
গত কয়েক দিনে ইরান থেকে প্রায় দুই হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব হামলায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। ফলে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সবই এখন প্রশ্নের মুখে।
যুদ্ধের আগুনে উপসাগরীয় শহরগুলো
ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু শুধু সামরিক ঘাঁটি বা দূতাবাস নয়। জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং পর্যটন কেন্দ্রেও আঘাত এসেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র দুবাইতেও বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছে আবাসিক ভবন। বিলাসবহুল হোটেলেও আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে।
যে শহরগুলো দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সংঘাতের বাইরে ছিল, সেগুলোও এখন সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে পর্যটক, বিদেশি ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় সরকারগুলোর সামনে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতদিন কার্যকর থাকবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কৌশলগত খাদ্য মজুত কতদিন টিকবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আরও বড় প্রশ্ন হলো, তারা কি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেবে, নাকি কূটনৈতিক পথেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে।
কূটনীতি নাকি সংঘাত?
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক সংঘাতের মাঝখানে আটকা পড়েছে যা তারা নিজেরা বেছে নেয়নি। তবুও তারা কূটনীতি, সংযম এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রস্তুতির সমন্বয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেক বছর ধরেই এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রও কেনা হয়েছে। মূল লক্ষ্য ছিল ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের সম্ভাব্য হুমকি ঠেকানো।
কিন্তু এখন সেই জোটই নতুন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে তাদের।

আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সমস্যা আরও জটিল। একদিকে ইরান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নিরাপত্তা হুমকি, বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য। অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের শক্তি ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাবের একটি ভারসাম্য হিসেবেও কাজ করে।
ফলে যুদ্ধের ফলে যদি ইরানের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। সেই পরিস্থিতিও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন দুশ্চিন্তার কারণ।
কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর
এমন সংকটের মধ্যেও উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে যুদ্ধ নয়, বরং উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজছে। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মহল ইতোমধ্যে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে।
একই সঙ্গে অনেক নেতা মনে করছেন, ভবিষ্যতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আঞ্চলিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান সংঘাত শেষ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















