মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে এশিয়ার বাজারে জেট জ্বালানির দাম হঠাৎ করেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বিশ্বজুড়ে বিমান ভাড়াও দ্রুত বাড়তে পারে।
এশিয়ায় জেট জ্বালানির দামে নজিরবিহীন উল্লম্ফন
এশিয়ার প্রধান জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্র সিঙ্গাপুরে জেট জ্বালানির দাম এক লাফে প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২২৫ ডলারে পৌঁছেছে। এটি এখন পর্যন্ত বাজারে সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে। কয়েক দিন আগেও একই জ্বালানির দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৩ ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পরিবহন হয়। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ চলাচল করে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দামে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই জেট জ্বালানির বাজারে তীব্র উত্থান শুরু হয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দাম প্রায় ৯৩ ডলার থেকে বেড়ে ২২৫ ডলারে পৌঁছে গেছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তবুও বাজার এখনো সেই আশ্বাসে পুরোপুরি আস্থা রাখছে না।
সরবরাহে চাপ বাড়ার আশঙ্কা
জেট জ্বালানি সাধারণত সীমিত মজুতেই রাখা হয় এবং এটি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেও বাজারে দ্রুত সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে দুবাইয়ের অপরিশোধিত তেল থেকে জেট জ্বালানি উৎপাদনের মুনাফা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি হয়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানির বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এশিয়ার শোধনাগারগুলোর ওপর বাড়ছে চাপ
এশিয়ার বেশ কয়েকটি শোধনাগারে ইতোমধ্যেই চাপ বাড়তে শুরু করেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান কাঁচা তেলের মজুত ধরে রাখতে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, আবার কিছু শোধনাগার নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আগেভাগেই শুরু করেছে।
ভারতের একটি বড় শোধনাগার ইতোমধ্যে জ্বালানি রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত তাদের উৎপাদিত জ্বালানির প্রায় ৪০ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি করে থাকে।
অন্যদিকে চীনও তাদের কোম্পানিগুলোকে নতুন জ্বালানি রপ্তানি চুক্তি স্বাক্ষর না করার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি আগের চুক্তির চালান বাতিল করার বিষয়েও ভাবতে বলা হয়েছে। যদি এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এশিয়ার জ্বালানি বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে।

মধ্যম মানের অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল পরিবহন হয় তার বড় অংশই মধ্যম মানের অপরিশোধিত তেল। এই ধরনের তেল থেকে জেট জ্বালানি ও ডিজেলের মতো মধ্যম ডিস্টিলেট বেশি উৎপাদন করা যায়।
যদি শোধনাগারগুলো আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বিকল্প তেল সংগ্রহ করে, তাহলে সেগুলো তুলনামূলকভাবে হালকা ধরনের তেল হবে। এতে পেট্রোল ও ন্যাফথার মতো হালকা জ্বালানি বেশি উৎপাদিত হবে, কিন্তু জেট জ্বালানি ও ডিজেলের উৎপাদন কম হতে পারে।
বাড়তে পারে বিমানের ভাড়া
বিশেষজ্ঞদের মতে, জেট জ্বালানি বিমান পরিচালনার সবচেয়ে বড় খরচের একটি। সাধারণত একটি এয়ারলাইনের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি খরচ হয়ে থাকে।
ফলে জেট জ্বালানির দাম এত দ্রুত বাড়লে বিমান সংস্থাগুলোকে বাড়তি খরচ সামলাতে টিকিটের দাম বাড়াতে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক উড়োজাহাজ ভাড়া দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব বেশি পড়তে পারে। এতে পর্যটন খাত, ব্যবসায়িক ভ্রমণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়লে বাড়বে মূল্যস্ফীতি
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার দেশগুলোতে খুব দ্রুত খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে, ভোক্তা ব্যয় কমে যেতে পারে এবং অনেক বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত হয়ে যেতে পারে।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানোর বিষয়েও নতুন করে ভাবতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান সংকটের সমাধান হয়ে যায় এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়, তবুও ইতোমধ্যে যে সরবরাহ বিঘ্ন ঘটেছে তার প্রভাব সহজে কাটবে না। কারণ এই ধাক্কা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের ভেতরে ঢুকে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















