ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধাক্কা লেগেছে। তেলের দাম ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিটে বড় পতন
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ০.৬ শতাংশ, ফলে বছরের শুরু থেকে যে সামান্য লাভ ছিল সেটিও প্রায় মুছে গেছে।
ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ এক পর্যায়ে ১,১০০ পয়েন্টের বেশি পড়ে যায়। পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও দিন শেষে ৭৮৪ পয়েন্ট বা ১.৬ শতাংশ কমে বন্ধ হয়েছে।
প্রযুক্তি খাতের সূচক নাসডাক কমেছে ০.৩ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে তেলের দামের প্রভাব
বিশ্বের আর্থিক বাজার এখন অনেকটাই তেলের দামের গতিপ্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বাড়ছে।
উচ্চ তেলের দাম সাধারণ মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে সুদের হার বাড়ার চাপও তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম বৃহস্পতিবার ৮.৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮১.০১ ডলারে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪.৯ শতাংশ বেড়ে ৮৫.৪১ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।
দিনের শেষভাগে তেলের দাম কিছুটা কমায় শেয়ারবাজারের ক্ষতিও কিছুটা কমেছে। তবে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি কতদিন তেল উৎপাদনে প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বাড়ছে
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোল পাম্পেও দেখা যাচ্ছে।
এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম এখন ৩.২৫ ডলার, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ২.৯৮ ডলার। অর্থাৎ এক সপ্তাহেই প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছে সেখানে দীর্ঘ সময় থাকে, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালীর ওপর। ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থিত এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবহন করা হয়।
এই পথ বিঘ্নিত হলে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশাবাদ
তবে ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার সাধারণত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় খুব বেশি না থাকে।
ওয়েলস ফারগো ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ স্কট রেন মনে করেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও বাজারে আতঙ্কের প্রভাব সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তার মতে, বিনিয়োগকারীরা যখন সংঘাত কমে আসার লক্ষণ দেখবেন, তখন বাজারও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে।
বড় প্রযুক্তি ও তেল কোম্পানির কারণে ক্ষতি কিছুটা কম
এই সপ্তাহে বড় ওঠানামা সত্ত্বেও এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক মোটের ওপর মাত্র ০.৭ শতাংশ কমেছে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাড়ায় বাজারের সামগ্রিক ক্ষতি কিছুটা কমেছে।
বিমান কোম্পানির শেয়ারে বড় পতন
উচ্চ তেলের দাম সবচেয়ে বেশি চাপ ফেলেছে বিমান সংস্থাগুলোর ওপর। জ্বালানির খরচ বাড়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লক্ষাধিক যাত্রী আটকে পড়েছেন।
ফলে মার্কিন বিমান সংস্থাগুলোর শেয়ার ব্যাপকভাবে কমেছে।
আমেরিকান এয়ারলাইন্সের শেয়ার কমেছে ৫.৪ শতাংশ।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের শেয়ার পড়েছে ৫ শতাংশ।
ডেল্টা এয়ার লাইন্সের শেয়ার কমেছে ৩.৯ শতাংশ।
ছোট কোম্পানির শেয়ারেও চাপ
ছোট কোম্পানিগুলোর শেয়ারও বড় ধাক্কা খেয়েছে। অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা এবং সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে সাধারণত ছোট কোম্পানির শেয়ার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ছোট কোম্পানির সূচক রাসেল ২০০০ কমেছে ১.৯ শতাংশ।

ব্রডকমের উত্থানে কিছুটা স্বস্তি
তবে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রডকমের শেয়ার ৪.৮ শতাংশ বেড়েছে। কোম্পানিটি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা ও আয় দেখানোর পর বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হক ট্যান জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপের আয় ৭৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
দিনশেষে সূচকের অবস্থা
দিনশেষে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৩৮.৭৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৬,৮৩০.৭১ পয়েন্টে।
ডাও জোন্স ৭৮৪.৬৭ পয়েন্ট কমে ৪৭,৯৫৪.৭৪ পয়েন্টে নেমেছে।
নাসডাক কমেছে ৫৮.৫০ পয়েন্ট, দাঁড়িয়েছে ২২,৭৪৮.৯৯ পয়েন্টে।
বন্ড বাজারেও চাপ
বন্ড বাজারেও প্রভাব পড়েছে। তেলের দাম বাড়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে ৪.১৩ শতাংশে উঠেছে। বুধবার এটি ছিল ৪.০৯ শতাংশ। আর ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ।
সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা অনিশ্চিত
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বেশি সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে।
তবে উচ্চ সুদের হার থাকলে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে, যা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ফেড আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, চলতি বছরের শেষের দিকে আবার সুদের হার কমানো শুরু করা হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ ও তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন মনে করছেন সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রীষ্মের দিকে পিছিয়ে যেতে পারে।

এশিয়া ও ইউরোপের বাজার পরিস্থিতি
এশিয়ার বাজারে আগের দিনের বড় পতনের পর বৃহস্পতিবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানো দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৯.৬ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের দিনের ১২.১ শতাংশ পতনের বড় অংশ পুনরুদ্ধার করেছে। বুধবারের পতন ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড়।
তবে ইউরোপের বাজারে সূচক কমেছে।
ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক কমেছে ১.৫ শতাংশ।
জার্মানির ডিএএক্স সূচক কমেছে ১.৬ শতাংশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















