ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনা এখন বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সংকট এশিয়ার বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের মতো অর্থনীতির জন্য এই পথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধাক্কার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজগুলো আন্তর্জাতিক জরুরি যোগাযোগ চ্যানেলে একটি সতর্ক বার্তা পায়। সেখানে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের নৌ চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই সতর্কবার্তার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে শত শত তেলবাহী জাহাজ ও তরল গ্যাসবাহী জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করতে শুরু করে।
মাত্র ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তেল ও তরল গ্যাস যায় এশিয়ার বাজারে।

এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীন এই পথ দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ তেলের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে জাপান, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে এই সমুদ্রপথের মাধ্যমে।
দীর্ঘদিন ধরেই এই দেশগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। অনেক দেশ কৌশলগত তেল মজুত তৈরি করেছে এবং সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করেছে। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই প্রস্তুতিও বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাড়বে মূল্যস্ফীতি
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে জ্বালানির দাম বাড়লেও সংরক্ষিত তেলের মজুত কিছুটা চাপ কমাতে পারে। কিন্তু সংঘাত যদি তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে এশিয়ার দেশগুলোতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে এবং শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে পরিবহন, ইস্পাত, রাসায়নিক শিল্প, জাহাজ নির্মাণ এবং প্রযুক্তি খাত বড় ধাক্কা খেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের শক্ত মজুত, তবু চাপ বাড়বে
চীন বিশ্বের বড় তেল উৎপাদকদের একটি হলেও দেশটির মোট চাহিদার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ নিজস্ব উৎপাদন থেকে আসে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর তাদের নির্ভরতা অনেক বেশি।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বিপুল পরিমাণ তেল মজুত তৈরি করেছে। ধারণা করা হয়, তাদের সংরক্ষিত তেলের পরিমাণ এতটাই বড় যে তা কয়েক মাসের আমদানি চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
তবুও তেলের দাম বাড়লে চীনের অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে। বিশেষ করে ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তার সময় এই ধাক্কা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ঝুঁকি বেশি
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশটি মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৭১ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরল গ্যাস আমদানি করে।
জাপানের অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন নয়। যদিও তাদের বিশাল কৌশলগত তেল মজুত রয়েছে, তবুও দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আমদানি হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জাপানের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
ভারতের জন্য নতুন জ্বালানি সমীকরণ
ভারত সম্প্রতি রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় সেই পরিকল্পনা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে সরাসরি তেল সরবরাহ বন্ধ না হলেও পরিবহন খরচ, বিমা ব্যয় এবং বাজারের অস্থিরতা দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় এবং মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উপসাগরে আটকে শতাধিক জাহাজ
মার্চের শুরু পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে অন্তত দুই শতাধিক তেলবাহী ও গ্যাসবাহী জাহাজ অপেক্ষায় ছিল। ইরাক, সৌদি আরব ও কাতারের উপকূলে এই জাহাজগুলো নোঙর করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্রপথে তেল পরিবহন পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নিয়ে এখনো বড় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















