ইন্দোনেশিয়ায় রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাড়ি ফেরার যে বিশাল যাত্রা প্রতি বছর দেখা যায়, এবার তার চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আগের বছরের তুলনায় ট্রেন, বাস ও অন্যান্য পরিবহনের টিকিট বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতা ও মানুষের অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন।
দেশটির লাখো মানুষ সাধারণত ঈদের সময় শহর ছেড়ে গ্রামে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে যান। কিন্তু এ বছর সেই যাত্রা যেন থমকে গেছে। ঈদ সম্ভাব্যভাবে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে উদযাপিত হতে পারে, তবু এখনো বিপুল সংখ্যক টিকিট বিক্রি হয়নি।
টিকিট বিক্রি কমে যাওয়ার অস্বাভাবিক পরিস্থিতি

দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত রেল পরিচালনা সংস্থা জানিয়েছে, মার্চের শুরু পর্যন্ত ঈদ মৌসুমের জন্য বরাদ্দ টিকিটের প্রায় ৫৬ শতাংশই অবিক্রীত রয়ে গেছে। কিছু রুটে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হলেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। এখনো বিভিন্ন রুটে প্রায় ২৪ লাখের বেশি টিকিট খালি রয়েছে।
গত বছর পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন ঈদের চার সপ্তাহ আগেই সব টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাস পরিবহন ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। আন্তঃনগর বাসের অতিরিক্ত সেবা এবার মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, যেখানে আগের বছরগুলোতে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সেবা বাড়াতে হতো।
বাস মালিকদের মতে, যাত্রী বাড়ার চাপ এবার মূলত ঈদের মাত্র চার দিন আগে দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে, যদিও তাতেও পরিবহন খাতের লাভ খুব বেশি বাড়ছে না।
ব্যয় সংকটে মানুষ বাড়ি ফেরার পরিকল্পনা বাতিল করছে

পরিবহন মন্ত্রণালয় ঈদের সময় বিমান ভাড়ায় প্রায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু অনেক মানুষের কাছে বিমান ভ্রমণ এখনো ব্যয়বহুল।
জাকার্তায় বসবাসকারী এক দম্পতি জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশি চাপে রয়েছে। ফলে তারা এ বছর সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। তাদের মতে, রাজধানীতে দৈনন্দিন খরচই এখন এত বেশি যে অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয় বহন করা কঠিন।
অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশে ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে মানুষের যাতায়াত সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে দেয়। মানুষ পরিবহন খাতে ব্যয় করে, উপহার কেনে এবং স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ায়। কিন্তু এ বছরের কম যাত্রা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশটির শপিং সেন্টারগুলোর সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, ঈদের আগে প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্রেতা এবার দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের আর্থিক অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি বলে তাদের ধারণা।
সরকারি প্রণোদনার চেষ্টা

ঈদের আগে বাজারে ব্যয় বাড়াতে সরকার সরকারি কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অবসরপ্রাপ্তদের জন্য বিপুল পরিমাণ উৎসব ভাতা বরাদ্দ করেছে। পাশাপাশি অনলাইন যাত্রী পরিবহন চালকদের জন্য ভর্তুকিও বাড়ানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এসব অর্থ বাজারে খরচ বাড়াতে কিছুটা ভূমিকা রাখবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক পরিবার এখন বিলাসী ব্যয়ের পরিবর্তে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, সঞ্চয় রক্ষা এবং ঋণ পরিশোধের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক ভোগব্যয় কমে যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি ও মধ্যবিত্ত সংকট
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, বাসস্থান ও সেবার খরচও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং মানুষের ব্যয় করার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।
উৎপাদন খাতে ছাঁটাইয়ের কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হওয়াও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতির বড় অংশই যেহেতু ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাই এই পরিবর্তন সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে।

নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, সরকারের কিছু বড় সামাজিক কর্মসূচি অর্থায়নের জন্য আঞ্চলিক প্রশাসনগুলোর বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে এই অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রবাহ তৈরি করত। এখন সেই প্রবাহ কমে যাওয়ায় ছোট ব্যবসা ও স্থানীয় বাজারে প্রভাব পড়ছে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মানুষের ব্যয়ের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা অনেক ভোক্তাকে সতর্ক করে তুলেছে।
অনেক পরিবার তাই এবারের ঈদ শহরেই কাটানোর পরিকল্পনা করছে। তারা কম খরচে বিনোদনের জায়গা খুঁজছে এবং অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















