মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা। সেই প্রভাব এসে পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও। চলমান রমজান ও সেচ মৌসুমে গ্যাস সংকট এড়াতে স্পট বাজার থেকে প্রায় দ্বিগুণ দামে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
সম্প্রতি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে জরুরি ভিত্তিতে এই গ্যাস কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘ হলে সামনে আরও চাপ বাড়তে পারে দেশের জ্বালানি ব্যয়ে।

দ্বিগুণ দামে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, দুটি আলাদা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুই কার্গো এলএনজি কেনা হয়েছে। একটি কার্গো প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ২৮ ডলার দরে এবং আরেকটি কার্গো ২৩ দশমিক ০৮ ডলার দরে কেনা হচ্ছে।
দুটি কার্গো এলএনজি কিনতে মোট খরচ পড়ছে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অথচ মাত্র এক মাস আগে একই পরিমাণ এলএনজি কিনতে খরচ হয়েছিল প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
এর মধ্যে একটি কার্গোর মূল্যই দাঁড়াচ্ছে প্রায় এক হাজার ২৭৯ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই ধরনের চালানের ক্ষেত্রে ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
মার্চে আসছে এলএনজি কার্গো
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, একটি এলএনজি জাহাজ আগামী ১৫ থেকে ১৬ মার্চের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আরেকটি কার্গো পৌঁছাতে পারে ১৮ থেকে ১৯ মার্চের মধ্যে।
মার্চ মাসে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো দেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। তবে নির্ধারিত সময়ের দুটি জাহাজ এখনও পথে আটকে থাকায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত গ্যাস নিশ্চিত করতে স্পট বাজারে দরপত্র আহ্বান করা হলেও কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। পরে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দুটি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নেয় পেট্রোবাংলা।

গ্যাস ঘাটতি ঠেকাতে রেশনিং
সাধারণত একটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস থাকে। বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৯০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
কোনো একটি জাহাজ বিলম্বিত হলেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয়ের আশা করছে জ্বালানি বিভাগ।
তিন সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ
গ্যাস সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানা ও কর্ণফুলী সার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে চিটাগাং ইউরিয়া সার কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়। অন্যদিকে কর্ণফুলী সার কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় এক হাজার ৭২৫ টন ইউরিয়া এবং প্রায় এক হাজার ৫০০ টন অ্যামোনিয়া।
ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দুই হাজার ৮৪০ টন। তিনটি কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে। তবে বোরো মৌসুমে সার সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলপিজি বাজারে অস্থিরতা
এদিকে ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা হলেও অনেক জায়গায় তা দুই হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে বৈঠকে এলপিজির দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, জাহাজ ভাড়া ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমানে বাজারে থাকা গ্যাস আগেই আমদানি করা হয়েছে, তাই এখনই দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই। তবে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে আগামী মাসে দাম সমন্বয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দেশের জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার পরিস্থিতি আরও চাপে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















