আনিসুল ইসলাম, ইউএনবি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা তৈরি করেছে। জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার টন রপ্তানি পণ্য আটকে পড়েছে বিভিন্ন স্থানে।
সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ঝুঁকির মুখে পড়ায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা করছেন বহুমাত্রিক সংকটের। এতে জ্বালানির ঘাটতি, পরিবহন ব্যয়ের রেকর্ড বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে রপ্তানি ও আমদানি নিয়ে সব উদ্যোক্তাই উদ্বিগ্ন।
![Dólar à vista [chevron_left]brby[chevron_right] fecha em baixa de 0,59%, a r$5,3220 na venda | Reuters](https://www.reuters.com/resizer/v2/MHG23WQZTBOMNJQEQ63C3U42BA.jpg?auth=86d70463298b5736467ad6032cfa684ac4213d9ea1849272359f455e3ce2ce96&width=1920&quality=80)
তিনি বলেন, “রপ্তানি চালান নিয়ে আমরা সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলছি এবং পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি।”
একই মত প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, রপ্তানির সঙ্গে আমদানিও গভীরভাবে যুক্ত। তাই ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, রপ্তানি-আমদানিতে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বা জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ব্যবসার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
বুধবার (৪ মার্চ) বিশ্ববাজারে তেলের দাম ২০২৫ সালের শুরু থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি ব্যারেল ৮২ দশমিক ৫৩ ডলার, আর ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ওঠে ৭৫ দশমিক ৩৭ ডলারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি আমদানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রধান প্রবেশপথ এই হরমুজ প্রণালী। এখানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা সরাসরি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব ফেলবে।
এই সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশের প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি হয়েছে জটিল পরিস্থিতি। কাতার, কুয়েত, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কয়েকটি বড় এয়ারলাইন ঢাকা থেকে কার্গো কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ফলে প্রধানত তৈরি পোশাকসহ প্রায় এক হাজার দুইশ টন রপ্তানি পণ্য বিমানবন্দরে আটকে আছে।

এদিকে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন মধ্যপ্রাচ্যমুখী নতুন কনটেইনার বুকিং বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন বন্দরে হিমায়িত মাছ, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও প্লাস্টিক পণ্যভর্তি এক হাজারের বেশি কনটেইনার আটকে রয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বাজারে পড়তে শুরু করেছে। আমদানিকারকদের মতে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পাম তেল পরিবহনের খরচ প্রতি টনে ৮ থেকে ১০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত, কিন্তু এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, শুরুতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জ্বালানি নিরাপত্তা। বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে এখনই জরুরি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার।
এই সংঘাত বাংলাদেশের জন্য সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট করে তুলেছে। অনেক জাহাজকে এখন হরমুজ অঞ্চল এড়িয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হচ্ছে, যা যাত্রাপথ প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে পরিবহন খরচ ও পণ্য পৌঁছাতে সময় দুটোই বেড়ে যাচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতেও। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে তুলা আমদানিতে বিলম্ব হওয়ায় বস্ত্রশিল্পে সমস্যা তৈরি হচ্ছে, আর প্লাস্টিক খাতও পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল আটকে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে।

বাণিজ্যের বাইরে আরও একটি বড় উদ্বেগ হলো উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি প্রবাসীর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। কারণ, তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা সরকারের প্রতি দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানসহ অনেকেই গবেষক, ব্যবসায়ী ও সরকারের মধ্যে জরুরি ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরামর্শ দিয়েছেন।
সরকার জানিয়েছে, দেশে কয়েক সপ্তাহের জ্বালানি ও খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি এবং জ্বালানির বিকল্প উৎস খোঁজা এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।
পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা দ্রুত কমে না এলে বাংলাদেশের সামনে কঠোর ব্যয়সংযম এবং বাড়তি অর্থনৈতিক অস্থিরতার একটি সময় আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















