যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা সামরিক অভিযান এখন নতুন বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সামরিকভাবে কিছু বড় সাফল্য মিললেও রাজনৈতিক লক্ষ্য এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কৌশল খুঁজে বের করার ওপর চাপ বাড়ছে।

খামেনির মৃত্যুর পর নতুন বাস্তবতা
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এমন ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে খুবই বিরল, কারণ একটি দেশের সরকারপ্রধানের নির্দেশে অন্য দেশের শীর্ষ নেতাকে হত্যার ঘটনা প্রায় দেখা যায় না।
তবে খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ক্ষমতাকাঠামো ভেঙে পড়েনি। দ্রুতই একটি নেতৃত্ব কাঠামো গড়ে ওঠে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণার সম্ভাবনাও সামনে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে বোঝা যাচ্ছে সামরিক আঘাত সত্ত্বেও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন এখনো নিশ্চিত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অগ্রগতি
যুদ্ধের সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। ইরানের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের বিমান বাহিনী কার্যত মাটিতে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও অস্ত্র শিল্পের ওপরও বড় ধরনের আঘাত হানা হয়েছে। আকাশ নিয়ন্ত্রণে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইচ্ছা তখন আক্রমণ চালাতে পারছে। একই সময়ে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটি ও শহরগুলোকে রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবুও ইরান মাঝেমধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করছে।
যুদ্ধের রাজনৈতিক দিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
এই যুদ্ধের আরেকটি দিক পুরোপুরি রাজনৈতিক। ইরানের কৌশল মূলত বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করা। তাদের জন্য টিকে থাকাটাই বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ইরান ইতিমধ্যে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে লেবাননে সংঘর্ষ বেড়েছে, যেখানে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ফ্রান্স ও ব্রিটেন তাদের সামরিক ঘাঁটি রক্ষায় প্রস্তুতি নিয়েছে।
নাটোও সরাসরি সংঘাতের প্রভাব অনুভব করেছে। মার্চের শুরুতে তুরস্কের দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস করা হয়।

জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা করেছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়।
একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস তরলীকরণ স্থাপনা ও সৌদি আরবের বড় তেল শোধনাগারও হামলার লক্ষ্য হয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও দ্রুত বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম ১০০ ডলারে পৌঁছালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

ইরানের ভেতরে অস্থিরতার আশঙ্কা
ইরানের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দেশটির প্রায় ৯ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
যদি এই পরিস্থিতিতে বিদ্রোহ বা বিচ্ছিন্নতাবাদ বাড়ে, তাহলে তা গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং উপসাগরীয় অঞ্চল, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পরামর্শ
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত যুদ্ধের লক্ষ্য স্পষ্ট করা এবং সীমিত লক্ষ্য অর্জনের পর সংঘাত শেষ করা। ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্য প্রায় অর্জিত হয়েছে বলেও অনেকের মত।
যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কৌশলগত সিদ্ধান্ত না নিলে এই সংঘাত আরও জটিল ও বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















