মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বাড়বে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
রবিবার প্রকাশিত পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ মাসিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ২০২৬)’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য তাৎক্ষণিক ও মধ্যমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার কারণে ঝুঁকি বেশি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রতি দেশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বর্তমানে জ্বালানি আমদানিতে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
এ অবস্থায় তেলের দাম সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। পিআরআই বলছে, প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যদি ১০ ডলার বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। আর দাম ২০ ডলার বাড়লে ব্যয় প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে প্রায় ৯২ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল প্রায় ৬৫ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সঙ্গে ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডলার চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি
তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি বিল পরিশোধে ডলারের চাহিদা বাড়বে। এতে বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব
প্রতিবেদনটিতে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্বের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের কারণে যদি এই রুটে কোনো বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে পিআরআই।
তেলের দাম ১৩০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৩০ ডলার বা তার বেশি পর্যন্ত উঠতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে শিল্পখাতে জ্বালানি রেশনিং চালু করতে হতে পারে, যা শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
রপ্তানিতে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা
পিআরআই জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদাও কমতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর খাতগুলোতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তেলের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়লে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় এক শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফলে প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ কমে ৩১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা এবং বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বহির্বাণিজ্য খাত এখনও নাজুক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য জ্বালানি ধাক্কা এমন সময়ে আসতে পারে যখন বাংলাদেশের বহির্বাণিজ্য খাত এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী হয়নি।
যদিও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, তবুও দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ছে এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও ধীরগতির। ফলে আমদানি ব্যয় হঠাৎ বাড়লে লেনদেন ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ ২০২৪ অর্থবছরে ছিল ১০৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ২০২৬ অর্থবছরে এটি প্রায় ১২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও কমছে
প্রতিবেদনটি বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই কিছুটা ধীরগতির লক্ষণ দেখাচ্ছে। ২০২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
এদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি, যা ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
দীর্ঘ সংঘাত অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলতে পারে
পিআরআই সতর্ক করে বলেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, বাণিজ্য ঘাটতি প্রসারিত হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সতর্ক সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















