নওগাঁ জেলার বিভিন্ন গ্রামে নীরব এক পরিবর্তন ঘটছে। ঐতিহ্যবাহী টুপি ‘কুপিয়া’ বোনা ও সূচিকর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার গ্রামীণ নারী এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন।
এক দশকেরও বেশি আগে ছোট একটি উদ্যোগ হিসেবে শুরু হওয়া এই কাজ এখন একটি সমৃদ্ধ কুটিরশিল্পে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে জেলার প্রায় ৫০ হাজার নারী জীবিকা অর্জন করছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের কর্মকর্তাদের মতে, নওগাঁর রপ্তানিমুখী টুপি বুনন খাতে কর্মরত শ্রমিকদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। তাদের বেশিরভাগই ঘরে বসেই গৃহস্থালির কাজ সামলানোর পাশাপাশি এই কাজ করেন।
তাদের নিখুঁত সূচিকর্ম করা টুপিগুলো প্রধানত ওমানে রপ্তানি করা হয়, যেখানে পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের অংশ হিসেবে এই টুপি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া এসব টুপি সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং আফ্রিকার তানজানিয়া ও মরক্কোর মতো দেশেও পাঠানো হয়।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ধারণা, এই শিল্প থেকে প্রতিবছর অন্তত ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে। বর্তমান চাহিদা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে শুধু নওগাঁ থেকেই প্রায় ৮০০ কোটি টাকার রপ্তানি হতে পারে।
গ্রামভিত্তিক শিল্পের বিস্তার
এই টুপি তৈরির কেন্দ্রগুলো প্রধানত মহাদেবপুর, মান্দা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে।
মহাদেবপুরে চাঁন্দাশ, মহাদেবপুর সদর ও উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম সূচিকর্মের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
নারী কারিগরদের কাছে নকশা আঁকা কাপড় সরবরাহ করা হয়। এরপর তারা রঙিন সুতা দিয়ে সূক্ষ্ম নকশা সেলাই করে টুপিতে ফুটিয়ে তোলেন।
কাজ শেষ হলে এজেন্টরা টুপিগুলো সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে দেন। পরে এসব ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় থাকা রপ্তানিকারকদের কাছে সরবরাহ করেন।
প্রতিটি টুপিতে হাতের কাজের আলাদা নকশা থাকে। এর মধ্যে চেইন, দেওয়ান, বোতাম, পুঁতির কাজ এবং মাছের কাঁটার মতো নকশা উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি নকশা তৈরিতে দক্ষতা ও সময়ের ভিন্নতা রয়েছে।
একটি কাপড়ের টুকরো থেকে নকশার ধরন অনুযায়ী ৯০ থেকে ১০০টি টুপি তৈরি করা সম্ভব।
ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ
অনেক গ্রামীণ নারীর জন্য টুপিতে সূচিকর্ম এখন অতিরিক্ত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
মহাদেবপুর উপজেলার খোশালপুর গ্রামের ৪০ বছর বয়সী গৃহিণী আশা বেগমকে একদিন তার বাড়ির উঠানে কয়েকজন নারীর সঙ্গে বসে টুপিতে সূচিকর্ম করতে দেখা যায়।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই সেলাই শিখেছিলাম। প্রায় দশ বছর আগে বিয়ে হয়ে এখানে আসার পর দেখি অনেক নারী এই কাজ করেন। তাদের সঙ্গে আমিও যুক্ত হয়েছি। এখন অবসর সময়ে সপ্তাহে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করতে পারি।
তার মতে, বর্তমানে ওই গ্রামে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন নারী টুপিতে সূচিকর্মের কাজে যুক্ত রয়েছেন।
কুঞ্জবন ঈদগাহপাড়া গ্রামের আরেক কারিগর জুলেখা বেগম জানান, নকশার ধরন ও মান অনুযায়ী শ্রমিকদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, কাজের ধরন অনুযায়ী একটি টুপির জন্য ১৬ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয়, তার তুলনায় পারিশ্রমিক এখনও কম।
সহজ নকশা তৈরি করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু পুঁতির জটিল নকশা করতে ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে ব্যবসা
স্থানীয় ব্যবসায়ী সুজন হোসেন এক দশকের বেশি সময় ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, বিদেশে চাহিদা বাড়ার কারণে এই শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে কাপড়, সুতা ও নকশা আনতে ফেনী বা নোয়াখালীতে যেতে হতো। এখন অধিকাংশ উপকরণ স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যায়।
বর্তমানে তিনি ২০ জন এজেন্টের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা করেন। প্রতিটি এজেন্টের অধীনে ৫০০ থেকে ১ হাজার নারী কারিগর কাজ করেন।
তিনি আরও বলেন, টুপিগুলো মূলত ওমানে রপ্তানি হয়, যেখানে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নকশার ওপর ভিত্তি করে একটি টুপির দাম ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এখন নওগাঁ জেলায় প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
সহায়তার প্রয়োজন
এই শিল্পের সাফল্য সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এখনও এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে।
তাদের মতে, সহজ ঋণসুবিধা, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ন্যায্য মজুরি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে শিল্পটি আরও শক্তিশালী হবে এবং হাজার হাজার নারীর জীবনমান উন্নত হবে।
মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, এই খাতে গ্রামীণ নারীদের অবদান সত্যিই উল্লেখযোগ্য।
তিনি বলেন, দূরবর্তী গ্রামের নারীরা টুপিতে সূচিকর্মের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। এটি তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি ইতিবাচক উদাহরণ।
তিনি আরও জানান, মজুরি বৈষম্যের অভিযোগগুলো প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববাজারে হাতে তৈরি এই টুপির চাহিদা বাড়তে থাকায় নওগাঁর কুপিয়া শিল্প শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পকে টিকিয়ে রাখছে না, বরং নীরবে গ্রামীণ পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকেও বদলে দিচ্ছে।
ইউএনবি 



















