ভারতের তীব্র গরমে শরীর ঠান্ডা রাখার সহজ উপায় হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনপ্রিয় একটি পানীয় হলো লস্যি। দই দিয়ে তৈরি এই পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি, আতিথেয়তা এবং খাদ্য ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও পরিচিত। সময়ের সঙ্গে এর রূপ বদলালেও মানুষের মনে লস্যির প্রতি ভালোবাসা আজও অটুট।
জালন্ধর, ভারত
এক অদ্ভুত আবিষ্কার: জুসের দোকানে ওয়াশিং মেশিন
প্রায় দুই দশক আগে, নতুন বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কাজের সূত্রে পাঞ্জাবের পাটিয়ালায় থাকার সময় একদিন ব্যস্ত বাজারের ভেতর একটি ছোট জুসের দোকানে ঢুকেছিলাম। দোকানের ভেতরে ফল, স্টিলের জার আর গ্লাসের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ চোখে পড়ল একটি ওয়াশিং মেশিন, যা ঘুরছে জোরে জোরে।
কৌতূহল জাগল—জুসের দোকানে ওয়াশিং মেশিন কেন?
দোকানদার হাসতে হাসতে জানালেন, এটি কাপড় ধোয়ার জন্য নয়। এই মেশিন দিয়েই তৈরি হয় লস্যি। আগে কাঠের ‘মাধানি’ দিয়ে দই ঘেঁটে ফেনায়িত করা হতো, এখন সেই কাজই করছে মেশিনটি। দোকানের মালিকের মাথায় রঙিন পাগড়ি, মুখে দাড়ি—একজন পাঞ্জাবি শিখ বিক্রেতা। দোকানে ক্রেতার ভিড় এত বেশি যে দ্রুত লস্যি বানাতে এই অভিনব পদ্ধতিই তার ভরসা।

লস্যি তৈরির ঐতিহ্য
ঐতিহ্যগতভাবে লস্যি তৈরি হয় টাটকা দই, পানি এবং চিনি বা লবণ মিশিয়ে। অনেক সময় এতে ফলের রস বা মশলাও যোগ করা হয়। এটি একদিকে যেমন স্বাদের পানীয়, তেমনি দইয়ের জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া থাকার কারণে স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।
ভারতে দই তৈরির পদ্ধতিও আলাদা। বাড়িতে সাধারণত দুধ ফুটিয়ে ঠান্ডা করে আগের দিনের দইয়ের সামান্য অংশ মিশিয়ে রেখে দেওয়া হয়। রাতভর সেট হয়ে পরদিন তৈরি হয় নতুন দই। এই প্রক্রিয়াটি একই সঙ্গে রান্নাঘরের বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
অন্যদিকে বাজারে যে দই বা ইয়োগার্ট পাওয়া যায়, তা সাধারণত নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। ফলে স্বাদ ও গঠনে কিছুটা পার্থক্য থাকে।
পরিবেশন ও স্বাদের বিশেষত্ব
উত্তর ভারতে লস্যি সাধারণত মাটির কাপ ‘কুলহড়’ বা স্টিলের গ্লাসে পরিবেশন করা হয়। এর ওপর থাকে ঘন মালাই বা দুধের সর। কখনও কখনও উপরে দেয়া হয় এক চামচ মাখন।
পাঞ্জাবিদের কাছে লস্যি শুধু পানীয় নয়, এটি ঘরের স্মৃতি এবং এক ধরনের রীতির অংশ। ভালো লস্যি না খুব পাতলা হবে, না খুব ঘন। গ্লাসের গায়ে হালকা আস্তরণ তৈরি করবে—যাতে চুমুক দেওয়ার আগে মালাই তুলে খাওয়া যায়।
লস্যি পান করার নির্দিষ্ট সময় নেই। অনেকেই সকাল বা দুপুরে পান করেন, আবার রাতের খাবারের সঙ্গেও এটি পরিবেশন করা হয়।
প্রাচীন গ্রন্থে লস্যির উল্লেখ
লস্যির ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ ঋগ্বেদ এবং ভারতের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি আয়ুর্বেদে এই পানীয়ের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এটি শরীর ঠান্ডা রাখে এবং হজমে সহায়তা করে।
লবণ ও ভাজা জিরা দিয়ে তৈরি লস্যি গরমে ক্লান্তি দূর করার কার্যকর পানীয় হিসেবে পরিচিত। আর মিষ্টি লস্যি দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ধরা হয়েছে—বিশেষ করে মাঠ থেকে ফিরে আসা কৃষক বা শিশুদের জন্য।
খাদ্য ইতিহাসবিদ কে. টি. আচার্য তাঁর গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, হাজার বছরেরও বেশি আগে দই, চিনি ও মশলা মিশিয়ে তৈরি করা পানীয় ‘রাসালা’ বা ‘মারজিকা’ লস্যির প্রাচীন রূপ হতে পারে। অনেকের মতে, এটিই বিশ্বের প্রথম দিকের ‘স্মুদি’ ধরনের পানীয়।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লস্যির নানা রূপ রয়েছে। রাজস্থান বা দক্ষিণ ভারতে এটি পাতলা মশলাদার বাটারমিল্ক হিসেবে পরিবেশন করা হয়, যার নাম চাস, নীর মোর বা মাজ্জিগা।
এই পানীয় শুধু তৃষ্ণা নিবারণ করে না, অতিথি আপ্যায়নের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অনেক সময় অতিথি এলে এটি স্বাগত পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয়।
পাঞ্জাবে লস্যি একদিকে গরমে শরীর ঠান্ডা করে, অন্যদিকে আতিথেয়তার প্রতীক। বিয়ে, বৈশাখী উৎসব বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় এতে যোগ করা হয় বাদাম, পেস্তা বা জাফরান।
শিখ ও হিন্দু মন্দিরে বিনামূল্যের সমবেত খাবারের সঙ্গে লস্যি বা চাস পরিবেশন করা হয়, যা সবার জন্য সমান খাবারের প্রতীক।
শীতকালেও জনপ্রিয়
লস্যি শুধু গ্রীষ্মের পানীয় নয়। পাঞ্জাবের শীতের সময়ও এটি খাওয়া হয়। সরিষার ক্ষেতে হলুদ ফুল ফুটে থাকা সেই সময়ে মানুষ মাক্কি দি রোটি ও সরসোঁ দা সাগের সঙ্গে লস্যি উপভোগ করে। সঙ্গে থাকে আচারি পেঁয়াজ এবং গুড়।
এটি পাঞ্জাবি খাবারের এক অনন্য স্বাদ।
বিশ্বজুড়ে লস্যির বিস্তার
সময়ের সঙ্গে লস্যি ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে জাপানে বোতলজাত ম্যাঙ্গো লস্যি, ইনস্ট্যান্ট লস্যি পাউডার এমনকি লস্যি স্বাদের আইসক্রিমও বিক্রি হচ্ছে।
ভারতের শহরগুলোতেও নতুন ধরনের লস্যি দেখা যাচ্ছে—চারকোল মিশ্রিত প্রোবায়োটিক লস্যি, নুটেলা লস্যি বা চকোলেট লস্যি।
এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান চাহিদা। গত বছর ভারতে লস্যির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন রুপি। তীব্র গরমে অনেক সময় খাবার সরবরাহকারী অ্যাপেও লস্যির স্টক শেষ হয়ে যায়।
ঐতিহ্যের দোকানগুলো
ভারতের বিভিন্ন শহরে কিছু লস্যির দোকান প্রায় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরের কাছে ‘জিয়ান দি লস্যি’, বারাণসীর ব্যস্ত গলিতে ‘পেহলওয়ান লস্যি’ এবং দিল্লির চাঁদনি চক এলাকার ‘জিয়ানিস’—এসব দোকান লস্যিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
প্রতিটি দোকানের স্বাদ আলাদা হলেও সবার মধ্যে আছে এক ধরনের নস্টালজিয়া।

শতবর্ষী লস্যির দোকান
জালন্ধরের পুরোনো সবজি বাজারে অবস্থিত শতবর্ষী দোকান ‘যোগা হালওয়াই’ এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। শনিবার বিকেলের শান্ত সময়েও দোকানের মালিক বিনোদ শর্মা ও তাঁর সহকারী একের পর এক গ্লাস লস্যি পরিবেশন করে চলেন।
একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তিনি ছোটবেলা থেকেই এখানে লস্যি খেতে আসেন।
বিনোদ শর্মা জানান, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের আগ থেকেই তাদের পরিবার এই দোকান চালাচ্ছে। তিনি এখন তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে ব্যবসা চালাচ্ছেন। ঈশ্বরের কৃপায় দোকান ভালোই চলছে বলেও জানান তিনি।
স্মৃতির স্বাদ
আজ লস্যি আধুনিক রূপে নানা জায়গায় বিক্রি হলেও এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে স্মৃতিতে। রাস্তার ধাবা থেকে টোকিওর দোকান—সবখানেই পৌঁছে গেছে এই পানীয়।
তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, এত পরিবর্তনের মধ্যেও কি লস্যি তার মূল স্বাদ ও আত্মা ধরে রাখতে পারবে?
আমার কাছে সেই জুসের দোকানের ওয়াশিং মেশিনে তৈরি লস্যিটাই আজও সেরা। ঘন, ফেনায়িত আর অবিস্মরণীয়—একটি স্মৃতি, যা আজও ঠান্ডা লস্যির মতোই সতেজ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















