০৯:৫৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স ক্রিপ্টো দুনিয়ায় দ্রুত উত্থান ‘স্টেবলকয়েন’-এর, ডলার নির্ভর এই মুদ্রা ঘিরে বাড়ছে ঝুঁকি ও সম্ভাবনার বিতর্ক ইরানপন্থী সমাবেশের আশঙ্কা, লন্ডনে ফিলিস্তিনপন্থী মিছিল নিষিদ্ধ করলেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমানিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর অনুমোদন হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ; তেল ছাড়তে প্রস্তুত জাপান ও জার্মানি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই থাইল্যান্ডের জাহাজে হরমুজ প্রণালীতে অজ্ঞাত হামলা, নিখোঁজ তিন নাবিক ইরান যুদ্ধে বেসামরিক ও শিশু মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ পোপ লিওর তেলের বাজারে অস্থিরতা: ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সুপারিশ আইইএর ইরানে নতুন করে ‘ব্যাপক হামলা’ শুরু করেছে ইসরাইল, একই সঙ্গে বৈরুতেও আঘাত

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় তেল ও সোনার দিকে ঝুঁকছে খুচরা বিনিয়োগকারীরা

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ প্রবণতায়ও। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তেল ও সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং যুদ্ধঝুঁকির বীমা খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাজারের তথ্য বলছে, অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটাল ডটকমে একদিনের মধ্যেই তেল দ্বিতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় ট্রেডারের সংখ্যা একদিনে ৪৯ শতাংশ বেড়েছে। লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৭৩ শতাংশ এবং সম্পাদিত ট্রেডের সংখ্যা বেড়েছে ৮২ শতাংশ।

এই প্রবণতা দেখায় যে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের বিনিয়োগ কৌশল বদলাচ্ছেন। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ও মূল্যবান ধাতুতে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

তেলের লেনদেনে বড় উল্লম্ফন

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়তেই তেলের বাজারে লেনদেন দ্রুত বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তেলের দিকে ঝুঁকছেন।

শুক্রবার থেকে সোমবারের মধ্যে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রথমবারের মতো তেলের বাজারে প্রবেশ করা ট্রেডারের সংখ্যা বেড়েছে ১,২৫৫ শতাংশ। সক্রিয় তেল ট্রেডারের সংখ্যা একদিনেই বেড়েছে ২৭৬ শতাংশ। প্ল্যাটফর্মে তেল আগে ষষ্ঠ বা সপ্তম স্থানে থাকলেও এখন দ্বিতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া সম্পদে পরিণত হয়েছে।

এ সময় তেল লেনদেনের মোট পরিমাণ বেড়েছে ৬৪৯ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। শুক্রবার যেখানে ৫১ শতাংশ ট্রেডার তেলের দাম বাড়বে ধরে নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, সোমবার সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে। এতে বোঝা যায়, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের অবস্থান বদলাচ্ছেন।

সোনার চাহিদাও বাড়ছে

বাজারের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা পেতে বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকেও ঝুঁকছেন। ঐতিহ্যগতভাবে অস্থির সময়ে সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুক্রবার থেকে সোমবারের মধ্যে সোনার লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। মোট ট্রেড বেড়েছে ৮৭ শতাংশ এবং সক্রিয় ট্রেডারের সংখ্যা বেড়েছে ৬১ শতাংশ।

পুরো সপ্তাহজুড়ে সোনা প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া সম্পদ ছিল।

বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। শুক্রবার যেখানে ৫৮ শতাংশ ট্রেডার সোনার দাম বাড়বে বলে অবস্থান নিয়েছিলেন, সোমবার সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই খুচরা বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে অবস্থান নিচ্ছেন।

বাজারে অবস্থান বদলাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক কাইল রডা বলেন, মূল্যবান ধাতু বিশেষ করে সোনা দীর্ঘদিন ধরেই খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয়।

তার ভাষায়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তা বর্তমানে অত্যন্ত বেশি। এর ফলে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে জ্বালানি বাজারে। সংঘাতের কারণে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করছেন। যদিও তেলের দাম প্রথম ধাক্কায় দ্রুত বাড়লেও কিছু বিনিয়োগকারী পরে সেই প্রবণতা থেকে সরে আসতেও শুরু করেছেন।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন

সংঘাতের কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ২ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন হয়, যা বিশ্বব্যাপী মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত নয়টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন শিপিং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর কাছে সমুদ্রপথে প্রায় ২০০টি জাহাজ অপেক্ষা করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত অনেক জাহাজ বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয় বেড়েছে

সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলের বীমা খরচও দ্রুত বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধঝুঁকির প্রিমিয়াম এক হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে।

বীমা প্রতিষ্ঠান এওনের এশিয়া অঞ্চলের সামুদ্রিক বিভাগের প্রধান স্টিফেন রুডম্যান বলেন, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বীমা বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

তার মতে, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দ্রুত বাড়ছে এবং স্বল্পমেয়াদে তা ওঠানামা করতে পারে।

বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কারণে শিল্পখাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১৭৫ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

একটি তেলবাহী ট্যাংকারের মূল্য সাধারণত ২০ থেকে ৩০ কোটি ডলারের মধ্যে হয়। সংঘাতের আগে যুদ্ধঝুঁকির বীমা সাধারণত জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল, যা প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলারের সমান।

কিন্তু এখন প্রিমিয়াম প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছালে একটি জাহাজের জন্য বীমা খরচ বেড়ে প্রায় ৭৫ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ

বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের ধরন এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় চলাচলের মাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই হার জাহাজের মূল্যের ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।

লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানিতে প্রায় এক হাজার জাহাজ চলাচল করছে, যেগুলোর মোট মূল্য ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিপিং কোম্পানিগুলো প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশ ডলার পর্যন্ত যুদ্ধ সারচার্জ আরোপ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে বাধ্য করা হয়, তাহলে ভ্রমণ সময় ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়বে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়বে।

সমুদ্রপথ স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ

এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথ স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে বিভিন্ন সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সময় মার্কিন নৌবাহিনী সেগুলোকে নিরাপত্তা দিতে পারে।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্যকে সহায়তা করতে রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা এবং আর্থিক গ্যারান্টি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ কত দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য: বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ার বাজারে নামতে প্রস্তুত ইলন মাস্কের স্পেসএক্স

মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় তেল ও সোনার দিকে ঝুঁকছে খুচরা বিনিয়োগকারীরা

০২:৪৪:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ক্রমেই বিস্তৃত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ প্রবণতায়ও। বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তেল ও সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং যুদ্ধঝুঁকির বীমা খরচ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

বাজারের তথ্য বলছে, অনলাইন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটাল ডটকমে একদিনের মধ্যেই তেল দ্বিতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির তথ্য অনুযায়ী, সক্রিয় ট্রেডারের সংখ্যা একদিনে ৪৯ শতাংশ বেড়েছে। লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৭৩ শতাংশ এবং সম্পাদিত ট্রেডের সংখ্যা বেড়েছে ৮২ শতাংশ।

এই প্রবণতা দেখায় যে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের বিনিয়োগ কৌশল বদলাচ্ছেন। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট এবং বাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ও মূল্যবান ধাতুতে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।

তেলের লেনদেনে বড় উল্লম্ফন

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়তেই তেলের বাজারে লেনদেন দ্রুত বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তেলের দিকে ঝুঁকছেন।

শুক্রবার থেকে সোমবারের মধ্যে কয়েকটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রথমবারের মতো তেলের বাজারে প্রবেশ করা ট্রেডারের সংখ্যা বেড়েছে ১,২৫৫ শতাংশ। সক্রিয় তেল ট্রেডারের সংখ্যা একদিনেই বেড়েছে ২৭৬ শতাংশ। প্ল্যাটফর্মে তেল আগে ষষ্ঠ বা সপ্তম স্থানে থাকলেও এখন দ্বিতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া সম্পদে পরিণত হয়েছে।

এ সময় তেল লেনদেনের মোট পরিমাণ বেড়েছে ৬৪৯ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে। শুক্রবার যেখানে ৫১ শতাংশ ট্রেডার তেলের দাম বাড়বে ধরে নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, সোমবার সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ শতাংশে। এতে বোঝা যায়, বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের অবস্থান বদলাচ্ছেন।

সোনার চাহিদাও বাড়ছে

বাজারের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা পেতে বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকেও ঝুঁকছেন। ঐতিহ্যগতভাবে অস্থির সময়ে সোনা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুক্রবার থেকে সোমবারের মধ্যে সোনার লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। মোট ট্রেড বেড়েছে ৮৭ শতাংশ এবং সক্রিয় ট্রেডারের সংখ্যা বেড়েছে ৬১ শতাংশ।

পুরো সপ্তাহজুড়ে সোনা প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া সম্পদ ছিল।

বিনিয়োগকারীদের মনোভাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। শুক্রবার যেখানে ৫৮ শতাংশ ট্রেডার সোনার দাম বাড়বে বলে অবস্থান নিয়েছিলেন, সোমবার সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই খুচরা বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদে অবস্থান নিচ্ছেন।

বাজারে অবস্থান বদলাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা

ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক কাইল রডা বলেন, মূল্যবান ধাতু বিশেষ করে সোনা দীর্ঘদিন ধরেই খুচরা বিনিয়োগকারীদের কাছে জনপ্রিয়।

তার ভাষায়, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তা বর্তমানে অত্যন্ত বেশি। এর ফলে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর প্রতি আগ্রহ আরও বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে জ্বালানি বাজারে। সংঘাতের কারণে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত তাদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করছেন। যদিও তেলের দাম প্রথম ধাক্কায় দ্রুত বাড়লেও কিছু বিনিয়োগকারী পরে সেই প্রবণতা থেকে সরে আসতেও শুরু করেছেন।

হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন

সংঘাতের কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ২ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন হয়, যা বিশ্বব্যাপী মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত নয়টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন শিপিং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর কাছে সমুদ্রপথে প্রায় ২০০টি জাহাজ অপেক্ষা করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত অনেক জাহাজ বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয় বেড়েছে

সংঘাতের কারণে জাহাজ চলাচলের বীমা খরচও দ্রুত বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধঝুঁকির প্রিমিয়াম এক হাজার শতাংশেরও বেশি বেড়ে গেছে।

বীমা প্রতিষ্ঠান এওনের এশিয়া অঞ্চলের সামুদ্রিক বিভাগের প্রধান স্টিফেন রুডম্যান বলেন, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বীমা বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

তার মতে, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দ্রুত বাড়ছে এবং স্বল্পমেয়াদে তা ওঠানামা করতে পারে।

বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর কারণে শিল্পখাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১৭৫ কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

একটি তেলবাহী ট্যাংকারের মূল্য সাধারণত ২০ থেকে ৩০ কোটি ডলারের মধ্যে হয়। সংঘাতের আগে যুদ্ধঝুঁকির বীমা সাধারণত জাহাজের মূল্যের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল, যা প্রায় ৬ লাখ ২৫ হাজার ডলারের সমান।

কিন্তু এখন প্রিমিয়াম প্রায় ৩ শতাংশে পৌঁছালে একটি জাহাজের জন্য বীমা খরচ বেড়ে প্রায় ৭৫ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ

বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজের ধরন এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় চলাচলের মাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রিমিয়াম নির্ধারিত হয়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই হার জাহাজের মূল্যের ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে।

লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানিতে প্রায় এক হাজার জাহাজ চলাচল করছে, যেগুলোর মোট মূল্য ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত হলে শিপিং কোম্পানিগুলো প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে তিন হাজার পাঁচশ ডলার পর্যন্ত যুদ্ধ সারচার্জ আরোপ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি জাহাজগুলোকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে বাধ্য করা হয়, তাহলে ভ্রমণ সময় ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়বে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়বে।

সমুদ্রপথ স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ

এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথ স্থিতিশীল রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখতে বিভিন্ন সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের সময় মার্কিন নৌবাহিনী সেগুলোকে নিরাপত্তা দিতে পারে।

এ ছাড়া উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্যকে সহায়তা করতে রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা এবং আর্থিক গ্যারান্টি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ কত দ্রুত স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে পারবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।