মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে দ্রুত পড়তে শুরু করেছে। রবিবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন করে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি ইরান যুদ্ধের সরাসরি ফল এবং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে রিপাবলিকান নেতারা পরিস্থিতিকে গুরুত্বহীন দেখানোর চেষ্টা করছেন।
রাজনীতিতে নতুন ইস্যু হিসেবে তেলের দাম
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান টম সুয়োজি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কয়েক মাস ধরেই তারা সতর্ক করে আসছিলেন যে জীবনযাত্রার ব্যয়ই এখন মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা। তার মতে, প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপের ফলেই এখন বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইরানে হামলার প্রথম মুহূর্তে অনেকেই মনে করেছিলেন এটি দ্রুত সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে যে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট পরিকল্পনা করা হয়নি। তার ভাষায়, শুরুতে হয়তো মানুষ সাময়িক উত্তেজনা অনুভব করে—“খারাপ শক্তিকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে”—কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি ভেবে দেখা হয়নি।

বিশ্ববাজারে তেলের বড় উল্লম্ফন
রবিবার প্রায় চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে। এই পরিস্থিতি ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে দুর্বল কর্মসংস্থান প্রতিবেদনসহ বেশ কিছু অর্থনৈতিক তথ্যও রিপাবলিকানদের চাপে ফেলেছিল। ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি বড় ইস্যু হয়ে উঠছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
বাজারের ওঠানামায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য পরিচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। সামাজিক মাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি শেষ হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে।
তার মতে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যদি সাময়িকভাবে তেলের দাম বাড়ে, তবে সেটিকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখার কিছু নেই। তিনি মন্তব্য করেন, যারা এই ব্যয়কে নিরাপত্তার জন্য গ্রহণযোগ্য মনে করেন না, তারা বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ।

ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা সমালোচনা
ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির চেয়ারম্যান কেন মার্টিন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে উপেক্ষা করছে। অথচ বাস্তবে পেট্রোলের দাম বাড়ছে এবং মুদি দোকানে পণ্যের দামও বাড়ছে, যার চাপ সরাসরি পড়ছে সাধারণ পরিবারের ওপর।
তার মতে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এখন আমেরিকান পরিবারগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ মাত্র এক সপ্তাহের হলেও জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না। যুদ্ধ কতদিন চলবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা দেওয়া হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
রিপাবলিকানদের প্রতিক্রিয়া
রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির মুখপাত্র কিয়ার্স্টেন পেলস বলেন, গ্যাসের দাম নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা অযথা ভয় তৈরি করছে। তার মতে, ট্রাম্প ইরানের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমেরিকার নিরাপত্তা রক্ষা করছেন, আর ডেমোক্র্যাটরা রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বাজারের উদ্বেগ বাড়ছে
তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকায় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই বাজারে দাম বাড়ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গত এক সপ্তাহে পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালনে গড়ে ৪৭ সেন্ট বেড়েছে বলে জানিয়েছে অটোমোবাইল সংস্থা এএএ।
অতীতের অভিজ্ঞতা
চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়েও জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল। রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ চালানোর পর রাশিয়ান তেল, গ্যাস ও কয়লা আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
এর ফলে ২০২২ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় পাঁচ ডলারে পৌঁছে যায়। তখন প্রশাসন কৌশলগত মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ছেড়ে দাম কমানোর চেষ্টা করেছিল। বর্তমানে গড় গ্যাসের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৩ ডলার ৪৫ সেন্ট।

ডেমোক্র্যাটদের নতুন দাবি
তেলের দাম বাড়তে শুরু করার পর ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার সরকারকে কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধের সিদ্ধান্তই জ্বালানির দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, গ্যাসের দাম বাড়লেও ট্রাম্প যেন তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। বরং তার প্রতিক্রিয়া ছিল—দাম বাড়লে বাড়ুক।
এতে বোঝা যাচ্ছে, তেলের দাম ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















