হো চি মিন সিটি — হোয়াং ত্রাং নামের এক তরুণ, যিনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরির খোঁজ করতে করতে একটি ক্যাফেতে কাজ করেন, চান্দ্র নববর্ষ উপলক্ষে হো চি মিন সিটি থেকে প্রায় আট ঘণ্টার বাসযাত্রা করে নিজের বাড়ি ডাক লাখ প্রদেশে যান।
পরিবারের সঙ্গে তিনি প্রতি বছরের মতোই নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী আচার পালন করেন। চাল ও শূকরের মাংস দিয়ে বিশেষ কেক তৈরি করা, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে প্রার্থনা করা এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা—সবই ছিল সেই আচার-অনুষ্ঠানের অংশ।
তবে এবারের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। ত্রাং বলেন, তার গ্রামটি এবার অনেকটাই ফাঁকা লাগছিল। তার কথায়, পরিবেশটা যেন কিছুটা বিষণ্ন ও নির্জন হয়ে উঠেছিল।
পরিবর্তিত হচ্ছে টেট উদযাপনের ধারা
ত্রাংয়ের অনেক বন্ধু এবার গ্রামের বাড়ি না গিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। কেউ দক্ষিণ ভিয়েতনামের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র ভুং তাউ বা ফু ইয়েনে গেছেন, আবার কেউ আরও দূরের গন্তব্য বেছে নিয়েছেন।

চলতি বছরের চান্দ্র নববর্ষ, যা ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পালিত হয়েছে, সেই সময়ে পর্যটনে ব্যয় গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। একই সময়ে সরকারি তথ্য অনুযায়ী, টেট উৎসবের আগে খুচরা বিক্রি বার্ষিক হিসাবে প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য টেট সাধারণত বছরের সবচেয়ে বড় আয়ের মৌসুম। তবে ভিয়েতনামে উৎসবের কেনাকাটার ধরনে এখন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এবছর অনেকেই আগের মতো অতিরিক্ত মজুত বা বিলাসী কেনাকাটা করেননি। বরং তারা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্যকর পণ্য, ভ্রমণ এবং প্রস্তুত খাবারের মতো ব্যবহারিক জিনিসে।
ব্যবসায়িক লেনদেন বেড়েছে
বিভিন্ন কোম্পানি টেট মৌসুমে বিক্রির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে। উইনমার্টের সুপারমার্কেট ও কনভিনিয়েন্স স্টোরগুলোতে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম লাজাদায় অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
আগে টেট এলে লাখো মানুষ শহর ও শিল্পাঞ্চল ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরতেন। এই সময়ে তারা তড়িঘড়ি করে কেনাকাটা করতেন এবং পরিবারের জন্য উপহার ও ভোজের উপকরণ কিনতেন। সাধারণত ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ ডং মূল্যের উপহার ঝুড়ি ও খাবারের উপাদান কেনা হতো।
তবে এবার ব্যয়ের ধরণ কিছুটা ভিন্ন ছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান টেটের সময়ও খোলা থাকায় মানুষকে আগের মতো অতিরিক্ত মজুত করতে হয়নি।
পরিকল্পিত ও সতর্ক কেনাকাটা
সেন্ট্রাল রিটেইল ভিয়েতনামের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান নুয়েন থি বিচ ভান জানান, উৎসবের দুই সপ্তাহ আগে থেকেই ধীরে ধীরে কেনাকাটা বাড়তে শুরু করে। শেষ মুহূর্তে হঠাৎ ভিড়ের প্রবণতা আগের মতো দেখা যায়নি।
তার মতে, ক্রেতারা এবার গড়ে ৬ লাখ থেকে ৮ লাখ ডং মূল্যের উপহার ঝুড়ি কিনেছেন। তারা পণ্যের দাম তুলনা করেছেন এবং পণ্যের উৎস যাচাই করে কিনেছেন। এটি একটি সতর্ক কিন্তু পরিকল্পিত ব্যয়ের প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
মূল্যস্ফীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভিয়েতনামের ভোক্তারা এখন আরও সতর্ক হয়ে উঠেছেন।
একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, মানুষ এখন অতিরিক্ত খরচের বদলে সুবিধাজনক কেনাকাটা, আগাম প্রস্তুতি এবং সচেতন সিদ্ধান্তের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
প্রস্তুত খাবার ও ভ্রমণের জনপ্রিয়তা
সুবিধার জন্য অনেক পরিবার এখন প্রস্তুত খাবার বা আগে থেকে অর্ডার করা ভোজের ব্যবস্থা বেছে নিচ্ছেন। উইনমার্টের মালিক প্রতিষ্ঠান মাসান জানিয়েছে, এ ধরনের সেবার চাহিদা বাড়ছে।

অন্যদিকে অনেক ভিয়েতনামির কাছে টেট এখন পরিবারে শান্ত সময় কাটানোর পরিবর্তে ভ্রমণের সুযোগ হয়ে উঠছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বিমান চলাচলেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। টেট সময়ে হো চি মিন সিটির বিমানবন্দরে ফ্লাইট বেড়েছে ৭ শতাংশ, দা নাংয়ে ৩৬ শতাংশ এবং ফু কুয়কে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের উত্থান
টেট এখনো ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় কেনাকাটার মৌসুম। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোক্তা পণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ বিক্রি হয় এই উৎসব ঘিরেই।
আগে টেটের সময় আদা মিষ্টি ও নানা ধরনের মিষ্টান্ন ছিল প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু এখন অনেকেই স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কিছু ক্রেতা আবার বিশেষ উপহার কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের ওয়াগিউ গরুর মাংস বা অস্ট্রেলিয়ার চেরির মতো আমদানিকৃত খাবার।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগে যেখানে পরিবারগুলো বেশি পরিমাণে মিষ্টি মজুত করত, এখন তারা পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে যা সবাই মিলে ভাগ করে খাওয়া যায়।

উৎসবের জীবনধারায় পরিবর্তন
জরিপ অনুযায়ী, পাঁচ বছর আগের তুলনায় এখন ভিয়েতনামিরা টেট উপলক্ষে কম সময় রান্না করেন এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার সংখ্যাও কমেছে।
এর পরিবর্তে মানুষ এখন নিজের জন্য সময় ব্যয় করছেন, অনলাইনে কেনাকাটা করছেন, ডিজিটাল মাধ্যমে লাকি মানি পাঠাচ্ছেন এবং ই-কমার্সের উৎসব অফার খুঁজছেন।
এই উৎসব মৌসুমে ইলেকট্রনিক পণ্য ও ফ্যাশন সামগ্রী বেশ জনপ্রিয় ছিল। পাশাপাশি বাড়ি সাজানোর সামগ্রী ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জামও ব্যাপক বিক্রি হয়েছে।
তবে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা এখনও সবচেয়ে বেশি। ফলমূল, মাছ, মাংস ও পানীয়ের বিক্রি সারা দেশে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















