মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎই তীব্র গতিতে বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা দুই হাজার বাইশ সালের পর সর্বোচ্চ। সরবরাহ কমে যাওয়া, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার—এই তিন কারণে বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সোমবার হঠাৎ করেই তীব্রভাবে বেড়ে যায়। দিনের শুরুতেই তেলের দাম দ্রুত বাড়তে বাড়তে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১১৯ ডলারে পৌঁছে যায়। একদিনেই এত বড় দাম বৃদ্ধিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় লাফ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গত সপ্তাহ থেকেই তেলের বাজারে অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক মানের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, আর যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডের তেল বেড়েছিল প্রায় ৩৬ শতাংশ।

গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় বন্ধ
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই পথ দিয়ে সাধারণত বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল গ্যাস পরিবহন হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তনেও বাজারে চাপ
ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। কঠোরপন্থী নেতা মুজতবা খামেনিকে দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণার পর বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংঘাত দ্রুত থামার সম্ভাবনা আরও কমে গেছে। এতে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

উৎপাদন কমাচ্ছে তেল উৎপাদক দেশ
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় তেল উৎপাদক দেশ ইতিমধ্যে উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে। ইরাকের প্রধান দক্ষিণাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে জানা গেছে। একই সময়ে কুয়েতও তেল উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং রপ্তানিতে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংরক্ষণাগার পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকেও শিগগিরই উৎপাদন কমাতে হতে পারে।
জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলার প্রভাব
যুদ্ধের প্রভাবে বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলের তেল শিল্প এলাকায় ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের একটি বড় তেলক্ষেত্রের দিকে ছুটে আসা একটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
এদিকে কাতারের বড় গ্যাস উৎপাদন স্থাপনায় হামলার পর সেখানকার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও বিশ্বজুড়ে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে জ্বালানির দাম বেশি থাকতে পারে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়া এবং পরিবহন ঝুঁকি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকার কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জোট এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারে বলেও জানা গেছে।

কৌশলগত মজুত ব্যবহারের আলোচনা
বিশ্ববাজারে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় অনেক দেশ কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এই মজুতই সাময়িকভাবে বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















