ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলোর ভুল হিসাব ও নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দামে।
অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। লেনদেনের শুরুতেই ব্যারেলপ্রতি দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে এবং তা দুই বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়াই বড় উদ্বেগের বিষয় নয়। বরং সাধারণ মানুষ যে জ্বালানি ব্যবহার করে—যেমন পেট্রল, ডিজেল ও বিমান জ্বালানি—এসবের দাম আরও দ্রুত গতিতে বাড়ছে।

বিমান জ্বালানি ও ডিজেলের দামে বড় লাফ
গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে বিমান জ্বালানির। এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিমান জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। কয়েক দিনের মধ্যেই এর দাম প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
একই সময়ে ডিজেল তৈরির প্রধান উপাদান গ্যাসতেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এশিয়ার বাজার ধীরে ধীরে জ্বালানি ঘাটতির সম্ভাবনাকে মূল্য নির্ধারণে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবাহিত হয়।
বর্তমান সংঘাতের ফলে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে বাজারে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে সমুদ্রপথটি খোলা রয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, বাজার এখনো সেই নিশ্চয়তায় পুরোপুরি আস্থা পাচ্ছে না।

সংঘাতের হিসাব বদলে দিল ইরানের পদক্ষেপ
অনেক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, আগের মতোই এই সংঘাতেও তেল স্থাপনা বা পরিবহন ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে না। কারণ এতে সংশ্লিষ্ট সব দেশেরই ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় যখন ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে আঘাত হানে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই পদক্ষেপ পুরো সংঘাতের হিসাবই বদলে দেয় এবং বাজারে আতঙ্ক বাড়ায়।
উপসাগরীয় অর্থনীতিতে চাপ
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ইরাকের অর্থনীতি মূলত তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমান উত্তেজনার কারণে এসব দেশের জ্বালানি রপ্তানি আয়েও বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে দুবাইয়ের মতো শহর, যা আর্থিক ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিকশিত হয়েছে, সেখানে ব্যবসা ও পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লাগছে।

জ্বালানি রপ্তানি কমানোর প্রবণতা
সংকটের আশঙ্কা বাড়তেই অনেক দেশ নিজেদের জ্বালানি মজুত রক্ষায় রপ্তানি কমানোর পথে হাঁটছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
খবরে জানা গেছে, কিছু বড় দেশ তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগারগুলোকে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। আবার কিছু দেশে পরিশোধনাগারের উৎপাদনও কমানো হয়েছে।
সংকট কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে একটি দেশ
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বড় উৎপাদনকারী দেশগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ বাড়ায়, তবে সম্ভাব্য সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব। বিশেষ করে বিশাল তেল মজুত ও অতিরিক্ত পরিশোধন ক্ষমতা থাকা দেশগুলো চাইলে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত অনেক দেশ নিজেদের স্বল্পমেয়াদি স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

বৈশ্বিক সমাধানের অভাব
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা। তাই এর সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক রাজনৈতিক নেতা কেবল নিজেদের দেশের প্রয়োজনের দিকে নজর দিচ্ছেন। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















