ঢাকায় ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানিয়েছে, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেশি সুদের হার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে সংগঠনটি।
ঢাকায় ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত এক গবেষণাপত্রে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। “বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি: বেসরকারি খাতের দৃষ্টিকোণ (জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৫)” শীর্ষক এই গবেষণাপত্রে দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক অবস্থা, ঝুঁকি এবং সম্ভাবনার বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগে দশ বছরের নিম্নগতি
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২.০৩ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩.৪৯ শতাংশ। একই সময়ে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮.২৮ বিলিয়ন ডলার এবং প্রবাসী আয়ের পরিমাণ হয়েছে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের চাপে ব্যবসা
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশে, যা ভোক্তা ও ব্যবসা উভয়ের ওপরই চাপ বাড়িয়েছে।
এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ১৬ শতাংশেরও বেশি হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণগ্রহণ কমে গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.১ শতাংশে, যা অন্তত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাব
গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চলমান অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় ৩.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথে সম্ভাব্য অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে নতুন শুল্কনীতি ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
এলডিসি উত্তরণে নতুন চ্যালেঞ্জ
ডিসিসিআই সতর্ক করে বলেছে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে নতুন বাণিজ্য ও অর্থায়নসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকলে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাও এলডিসি উত্তরণের পর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ডিসিসিআই অন্তত তিন বছর এলডিসি উত্তরণ স্থগিত রাখার সুপারিশ করেছে, যাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো, নীতিগত সমন্বয় এবং একটি কার্যকর উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের জন্য সময় পাওয়া যায়।
প্রধান খাতগুলোর পরিস্থিতি
গবেষণাপত্রে দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতের পারফরম্যান্সও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি হয়েছে ১৯.৩৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আগের সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ছিল এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
চামড়া খাত, যা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি শিল্প, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৬০৯.৮৬ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করেছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে এ খাতের অংশ মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ, যা উন্নত মান ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অন্যদিকে ওষুধ শিল্পের রপ্তানি ২০.৩২ শতাংশ বেড়ে ১১৮.৮১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে হালকা প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি ১০.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৫.৫২ মিলিয়ন ডলারে।
অর্থনীতি চাঙ্গা করতে করণীয়

অর্থনীতির উন্নতির জন্য ডিসিসিআই বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করের আওতা বাড়ানো, পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং বিনিয়োগ বাড়াতে ধীরে ধীরে নীতিগত সুদের হার কমানো।
এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন, নতুন বাজারে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ সহজ করা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেমিনারে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, দেশীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সময়োপযোগী অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ সহায়তা, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















