মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানি ও বড় আর্থিক বিনিয়োগকারীরা গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া সামরিক সংঘাত এখন সেই বিপুল বিনিয়োগকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। যুদ্ধের বিস্তার এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ফলে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যকেন্দ্র ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে গড়ে ওঠা বিশাল প্রকল্পগুলো এখন নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং উপসাগরীয় সরকারগুলো সবাই এখন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রযুক্তি বিনিয়োগের উত্থান
দীর্ঘদিন ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনসহ উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বিলাসবহুল ব্যবসায়িক কেন্দ্র, সহজ বিনিয়োগ নীতি এবং উন্নত অবকাঠামো দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানি ও ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানায়।

এই দেশগুলোর লক্ষ্য ছিল তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন অর্থনৈতিক খাত তৈরি করা। সে লক্ষ্যে তাদের বিশাল সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ব্যবহার করে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু হয়।
এই সুযোগে প্রযুক্তি জগতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান উপসাগরীয় অঞ্চলে তথ্যকেন্দ্র ও প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে বিশাল তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা ছিল।
যুদ্ধের ধাক্কায় বদলে যাচ্ছে হিসাব
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর সমন্বিত হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর জবাবে ইরান বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায় এবং সেই হামলার প্রভাব পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ওপরও।
ড্রোন হামলায় আমিরাতে অবস্থিত দুটি বড় তথ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাহরাইনের একটি কেন্দ্রেও আঘাত লাগে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান দূরবর্তী কাজের ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কুয়েত, লেবানন ও সৌদি আরবে তাদের দূতাবাস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ দ্রুত বেড়ে গেছে। অনেক উপসাগরীয় রাষ্ট্র এখন বিদেশে বিনিয়োগ কমানোর বিষয়েও ভাবছে বলে জানা গেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক কেন্দ্র হওয়ার স্বপ্ন
উপসাগরীয় অঞ্চলকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। আবুধাবিতে শুরু হওয়া বিশাল তথ্যকেন্দ্র প্রকল্পটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তথ্যকেন্দ্র হওয়ার কথা ছিল।
এছাড়া একাধিক দেশ একসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার ঘোষণা দেয়। ভৌগোলিক অবস্থান, সস্তা বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত জমি এবং দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণের সক্ষমতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলকে প্রযুক্তি বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
ইতিমধ্যে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শতাধিক তথ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে এই অঞ্চল দ্রুত বৈশ্বিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছিল।
সমুদ্রতলের তারেও নতুন ঝুঁকি
এই অঞ্চলের আরেকটি বড় ঝুঁকি সমুদ্রের নিচ দিয়ে যাওয়া ফাইবার অপটিক যোগাযোগ লাইন। হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর দিয়ে যাওয়া এসব তার ইউরোপ ও এশিয়ার ইন্টারনেট সংযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এই তারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বৈশ্বিক তথ্য আদানপ্রদানেও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগেও একটি ঘটনার ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে তথ্য চলাচলের বড় অংশ কয়েক মাস ধরে বিঘ্নিত হয়েছিল।
নতুন বাস্তবতায় নিরাপত্তা ভাবনা
এখন প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। আগে প্রধান উদ্বেগ ছিল সাইবার হামলা, কিন্তু এখন সরাসরি সামরিক হামলার ঝুঁকিও সামনে এসেছে।
ফলে তথ্যকেন্দ্র, প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সহ্য করতে পারে এমন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের কথাও বিবেচনায় আসছে।
একসময় যে ঝুঁকিগুলোকে দূরবর্তী আশঙ্কা বলে মনে করা হতো, এখন সেগুলো বাস্তব হয়ে উঠেছে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধের বিস্তার উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ পরিবেশকে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















