মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে হঠাৎ বড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যাহত করায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে আবারও জ্বালানি সরবরাহকারী শক্তি হিসেবে নিজের গুরুত্ব বাড়তে দেখছে রাশিয়া। একই সঙ্গে ইউরোপকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
ইউরোপ বহুদিন ধরে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংকট বিশ্ববাজারে চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে রাশিয়া আবারও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হিসেবে সামনে আসছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব
ফেব্রুয়ারির শেষদিকে শুরু হওয়া ইরান সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দেয়। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যাহত হয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে যে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, সেই পথ প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
রাশিয়ার কৌশলগত বার্তা
এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ইউরোপের দিকে রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। ভ্লাদিমির পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউরোপ যদি রাশিয়ার জ্বালানি থেকে দূরে থাকার নীতি চালিয়ে যায়, তবে মস্কো নিজেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।
পুতিনের বক্তব্যে স্পষ্ট, এখন নতুন বাজার খুলছে এবং ইউরোপে সরবরাহ বন্ধ করাই রাশিয়ার জন্য লাভজনক হতে পারে। এই মন্তব্যের মাধ্যমে ইউরোপকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছে মস্কো।
রাশিয়ার জন্য স্বস্তির সুযোগ
গত এক বছরে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে আয় প্রায় এক চতুর্থাংশ কমে গিয়েছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে গিয়ে দেশটির অর্থনীতির ওপর বড় চাপ পড়ে।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর রাশিয়ার জ্বালানির চাহিদা আবার বাড়ছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার কর্মকর্তাদের মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে রাশিয়ার জ্বালানির চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইউরোপের দোটানা
২০২২ সালের পর থেকে ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানি নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়েছে। এক সময় ইউরোপের গ্যাসের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং তেলের ২৭ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। এখন তা কমে গ্যাসে প্রায় ১৩ শতাংশ এবং তেলে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউরোপ বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকেছে, যার মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র। তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও প্রশ্ন উঠছে, রাশিয়ার জ্বালানি কি ইউরোপের জন্য বিকল্প হতে পারে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আবার রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় ভুল হবে।
এশিয়ায় নতুন সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে এশিয়াতেও জ্বালানি সরবরাহের সমীকরণ বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে চীন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ভোক্তা, তার জন্য নতুন সরবরাহ উৎসের প্রয়োজন বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও ভেনেজুয়েলা মিলিয়ে চীনের প্রায় ১৭ শতাংশ তেল আমদানি আসে। এই দুই উৎসে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে রাশিয়াই বড় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে ভারতও আবার রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি
ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপে গ্যাসের দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দামও দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ৯১ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্ববাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপসহ অনেক দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যতদিন চলবে, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতাও ততদিন অব্যাহত থাকবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















