মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করায় এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। যুদ্ধের প্রভাব যেন অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে না দেয়, সে জন্য বিভিন্ন দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কোথাও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, কোথাও রেশনিং চালু করা হয়েছে, আবার কোথাও সরকারি মজুত থেকে জ্বালানি ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সোমবার ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারেরও বেশি ছুঁয়েছে, যা কোভিড মহামারির পর সর্বোচ্চ। এই পরিস্থিতি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ অঞ্চলটির অধিকাংশ দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী, যা ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়, যার বড় অংশই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে।
বর্তমান সংঘাতের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সরবরাহ ঘাটতির সহজ বিকল্প নেই এবং বাজারে ইতিমধ্যে বাস্তব ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন জরুরি ব্যবস্থা
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়া প্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট জ্বালানির মজুত লুকিয়ে রাখা বা মূল্য কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতের পুনে শহরে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে সাময়িকভাবে গ্যাসচালিত দাহকার্য বন্ধ করা হয়েছে। পরিবর্তে কাঠ বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
পাকিস্তান আবার ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। দেশটি সাধারণ গাড়িচালকদের ব্যবহার কমাতে পেট্রোলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়েছে, তবে পরিবহন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ট্রাক ও বাসের জন্য ডিজেলের দাম কম রাখার চেষ্টা করছে।
![]()
কৌশলগত মজুত ব্যবহারের ভাবনা
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন তাদের কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহারের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জাপানেও সরকারি তেল সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মজুত তেল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, মজুত তেল ব্যবহার করা সহজ নয়। সংরক্ষিত জ্বালানি দ্রুত বাজারে আনা এবং শোধনাগারে পৌঁছানো অনেক সময় জটিল হয়ে ওঠে।
ইতিমধ্যে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জাপানের একটি বড় রাসায়নিক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল ন্যাফথা সংগ্রহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।

তাইওয়ানের সরবরাহ নিশ্চিতের চেষ্টা
তাইওয়ান তার জ্বালানির প্রায় ৯৬ শতাংশ আমদানি করে এবং এর বড় অংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ফলে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশটি দ্রুত নতুন জ্বালানি চালান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
এপ্রিল পর্যন্ত চাহিদা পূরণে তাদের ২২টি তরল গ্যাসবাহী জাহাজ প্রয়োজন ছিল, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ২০টির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে দেশে গ্যাস বা বিদ্যুতের ঘাটতি হবে না।
একই সঙ্গে তারা পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কিছুটা বাড়ালেও কর কমিয়ে ভোক্তা ও শিল্প খাতের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে।
চাহিদা কমানোর উদ্যোগ
কিছু দেশ আবার সরাসরি জ্বালানির ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
ফিলিপাইনে রাজধানী ম্যানিলা, সেবু এবং নেগ্রোস অক্সিডেন্টালসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস চালু করা হয়েছে। সরকারের মতে, এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তারা এমন একটি যুদ্ধের প্রভাব ভোগ করছে যা তাদের পছন্দের নয়, এবং এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে তা এখনো অনিশ্চিত।
![]()
বাংলাদেশের সংকট
বাংলাদেশও এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। সরকার ইতিমধ্যে জ্বালানি রেশনিং চালু করেছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে।
গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস আমদানিতে দেশের বাজেটের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসে, যা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
সম্প্রতি গণআন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার অর্থনৈতিক অস্থিরতা এড়াতে মরিয়া হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ভিয়েতনামে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ
ভিয়েতনামে ইতিমধ্যে জ্বালানির দাম কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে এবং সামনে আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অনেক মানুষ আগেভাগেই গাড়ির ট্যাংক ভরতে পেট্রোল পাম্পে ভিড় করছেন।
হ্যানয়ের অনেক পাম্পে ইতিমধ্যে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার নোটিশ দেখা যাচ্ছে।
একজন মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক জানান, আগে যেখানে পাঁচ মিনিটে জ্বালানি ভরা যেত, এখন সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে তার জ্বালানি খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু যাতায়াত নয়, খাদ্যসহ প্রায় সব কিছুর দামই বাড়বে।
মাছ ধরার মৌসুমের শুরুতেই উপকূলের অনেক জেলে জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে সমুদ্রে যাওয়া পিছিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ট্রাকচালকদের জন্যও কারখানা ও বন্দরে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের এই বিঘ্ন কাটতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে এশিয়ার দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















