যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে, যার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ। গ্যাসোলিনের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তা ব্যয়, পণ্যের দাম এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তেলের দামের হঠাৎ উল্লম্ফন
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিলে দাম কিছুটা কমে প্রায় ৮৫ ডলারে নেমে আসে।
ট্রাম্প বলেন, তিনি আগে থেকেই জানতেন এই পদক্ষেপ নিলে তেলের দাম বাড়তে পারে। তবে তার ধারণার তুলনায় দাম কম বেড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্বনেতাদের জরুরি বৈঠক
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর সংগঠন জি-সেভেন জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে জাতীয় মজুত তেল বাজারে ছাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তারা সে সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে থাকায় বিভিন্ন দেশের সরকার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের ওপর চাপ
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর। সোমবার দেশটিতে গ্যাসোলিনের গড় দাম প্রতি গ্যালনে প্রায় ৩ দশমিক ৪৮ ডলারে পৌঁছায়, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ বেশি।
জ্বালানির দাম বাড়ায় আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। শেয়ারবাজারের প্রধান সূচকগুলো প্রথমে বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ে। পরে হোয়াইট হাউস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আশ্বস্ত করলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র জানান, তেলের দামের এই বৃদ্ধি সাময়িক এবং সামরিক অভিযানের লক্ষ্য পূরণ হলে দাম আবার দ্রুত কমে আসবে।

ভোক্তা ব্যয়ে ধাক্কার আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে। ফলে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়ে যায়। এতে ভোক্তারা ব্যয় কমাতে বাধ্য হন, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাকসেস ম্যাক্রোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টিম মাহেডি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বড় অংশই ভোক্তা ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। গত বছরও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল ভোক্তা ব্যয়।
কিন্তু এখন অনেক আমেরিকান তাদের সঞ্চয় প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। এর মধ্যে জ্বালানির দাম বাড়া অর্থনীতির জন্য খারাপ সময়ে নতুন চাপ তৈরি করছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মন্দার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধের স্থায়িত্ব বড় প্রশ্ন
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাব কতটা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার ওপর।
সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। যদি এই বিঘ্ন দীর্ঘ সময় ধরে থাকে, তবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, খুব শিগগিরই হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
দীর্ঘ সংঘাত হলে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি
অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়, তবে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবও তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি হতে পারে।
তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে পণ্যের দাম বাড়বে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রায় দুই শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতি চার শতাংশেরও ওপরে যেতে পারে।
এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়বে এবং দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় কম বাড়তে পারে।
অর্থনীতিতে বাড়তি চাপের সময় নতুন সংকট
এই নতুন ঝুঁকি এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ইতিমধ্যে নানা চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনও বেশি, শ্রমবাজারেও দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার, উচ্চ শুল্কনীতি এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তন ইতিমধ্যে অর্থনীতিতে নানা ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে। তার ওপর ইরান যুদ্ধ নতুন ধাক্কা হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
টিম মাহেডি বলেন, এই প্রশাসনের নীতিগুলো ধারাবাহিকভাবে অর্থনীতিতে সরবরাহ সংকট তৈরি করছে। শুল্কনীতি ও অভিবাসন নীতির পর এবার যুদ্ধ সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকারের আশাবাদী অবস্থান
সব সতর্কবার্তার পরও ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আশাবাদী অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, গ্যাসোলিনের দাম বাড়া নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন এবং এই অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তবে তিনি প্রয়োজনে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি, যা সংঘাতকে আরও বড় আকার দিতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজের জন্য সীমিত নিরাপত্তা ও বীমা সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আরোপিত কিছু তেলসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ানো যায়।
হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট বলেন, বর্তমানে কিছু বিঘ্ন তৈরি হলেও প্রশাসন দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেই কাজ করছে।
#ইরানযুদ্ধ #তেলেরদাম #বিশ্বঅর্থনীতি #মার্কিননীতি #মুদ্রাস্ফীতি

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















