২০২৬ সালের শুরুতেই চীনের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেছে। বছরের প্রথম দুই মাসে দেশটির রপ্তানি ২১.৮ শতাংশ বেড়ে চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি খাতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় এই শক্তিশালী প্রবণতা বছরের বাকি সময়েও অব্যাহত থাকতে পারে।
বছরের শুরুতেই শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি
চীনের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার জানিয়েছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মিলিয়ে দেশটির রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৬৫৬.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১.৮ শতাংশ বেশি। গত চার বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি।
এই বৃদ্ধি ডিসেম্বরের ৬.৬ শতাংশ এবং পুরো ২০২৫ সালের ৫.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।
চীনে সাধারণত বছরের প্রথম দুই মাসের বাণিজ্য তথ্য একসঙ্গে প্রকাশ করা হয়। কারণ চীনা নববর্ষের ছুটি কখনও জানুয়ারি আবার কখনও ফেব্রুয়ারিতে পড়ে, যা মাসভিত্তিক তথ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবণতা বোঝাতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তথ্য একত্রে প্রকাশ করা হয়।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বাড়ার প্রভাব
ম্যাকোয়ারি গ্রুপের প্রধান চীন অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু বলেছেন, এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী চাহিদা, বিশেষ করে প্রযুক্তি পণ্যের জন্য। অনেক দেশের অর্থনীতিতে এখন প্রযুক্তি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
![Dólar à vista [chevron_left]brby[chevron_right] fecha em baixa de 0,59%, a r$5,3220 na venda | Reuters](https://www.reuters.com/resizer/v2/MHG23WQZTBOMNJQEQ63C3U42BA.jpg?auth=86d70463298b5736467ad6032cfa684ac4213d9ea1849272359f455e3ce2ce96&width=1920&quality=80)
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই গতি কতদিন থাকবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি বিনিয়োগের উত্থান কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী বৈদেশিক চাহিদা থাকায় দেশীয় চাহিদা বাড়াতে সরকারের তেমন তাড়াহুড়া করার প্রয়োজনও কমে যেতে পারে।
উদ্দীপনা প্যাকেজের সম্ভাবনা কম
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝাং ঝিওয়েইও একই মত প্রকাশ করেছেন। তার মতে, শক্তিশালী রপ্তানি এবং তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ ইঙ্গিত দেয় যে চীন এখনই বড় কোনো অর্থনৈতিক উদ্দীপনা কর্মসূচি ঘোষণা করার সম্ভাবনা কম।
যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমলেও বড় বাজার
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্ক বাড়ানো এবং বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব এখনও রপ্তানিতে দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম দুই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ১১ শতাংশ কমেছে।
তবে এই পতন ডিসেম্বরের ৩০ শতাংশ এবং পুরো ২০২৫ সালের ২০ শতাংশ পতনের তুলনায় কিছুটা কম। তবুও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে চীনের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার ছিল।
আসিয়ান ও ইউরোপে রপ্তানি বাড়ছে দ্রুত

চীনের বৃহত্তম আঞ্চলিক বাণিজ্য অংশীদার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ২৯.৪ শতাংশ বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১১.২ শতাংশ এবং পুরো ২০২৫ সালে ছিল ১৩.৪ শতাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নেও চীনের রপ্তানি দ্রুত বেড়েছে। বছরের প্রথম দুই মাসে সেখানে রপ্তানি ২৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিসেম্বর মাসে এই বৃদ্ধি ছিল ১১.৬ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ছিল ৮.৪ শতাংশ।
জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালিতে রপ্তানি যথাক্রমে ৩১.৩ শতাংশ, ৩১.৯ শতাংশ এবং ৩৬.৪ শতাংশ বেড়েছে।
বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে বাড়ছে চাপ
বিশ্বের কয়েকটি বড় বাণিজ্য অংশীদার দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে। ঝাং ঝিওয়েই মনে করেন, বর্তমান শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তাদের সেই যুক্তিকেই আরও শক্তিশালী করবে।
লাতিন আমেরিকায় রপ্তানি ১৬.৪ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে ডিসেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৯.৮ শতাংশ। আফ্রিকায় রপ্তানি প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ডিসেম্বরের ২১.৮ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি।
জ্বালানি নিরাপত্তায় বাড়ছে তেল আমদানি
বছরের শুরুতে চীন জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চীন ৯৬.৯৩ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ১৫.৮ শতাংশ বেশি।
এই সময়ে মোট আমদানি ১৯.৮ শতাংশ বেড়েছে, যা ডিসেম্বরের ৫.৭ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক দ্রুত।
বাণিজ্য উদ্বৃত্তে নতুন রেকর্ড
২০২৫ সালে চীনের রপ্তানি ৫.৫ শতাংশ বাড়ায় মোট রপ্তানির মূল্য দাঁড়ায় ৩.৭৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ফলে পণ্য বাণিজ্যে রেকর্ড ১.১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়।
বিরল খনিজ রপ্তানিও বেড়েছে
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে চীনের বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ রপ্তানি পরিমাণের হিসেবে ২৩ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০,৪৬৮.৩ টন। ডিসেম্বর মাসে এই রপ্তানি ছিল ৪,৩৯২.১ টন।
![]()
উচ্চপ্রযুক্তি খাতেই বাড়বে রপ্তানির গতি
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শু তিয়ানচেনের মতে, বছরের বাকি সময়ে চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মূলত উচ্চপ্রযুক্তি খাতেই কেন্দ্রীভূত হবে। এর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সরবরাহ শৃঙ্খল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিদেশে বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও গাড়ির চাহিদাও শক্তিশালী থাকবে, যা অন্য খাতের দুর্বলতাকে কিছুটা পুষিয়ে দিতে পারে।
একই সময়ে চীনের রপ্তানি কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। সরকার সৌর প্যানেল ও ইস্পাত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে নীতি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে পোশাক ও জুতার মতো শ্রমনির্ভর শিল্প দীর্ঘমেয়াদে ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















