ইরানের রাজধানী তেহরান গত ১০ দিন ধরে চলা যুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ বোমাবর্ষণের একটি রাত পার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় শহরের বহু এলাকা কেঁপে ওঠে, আতঙ্কে রাত কাটান লাখো বাসিন্দা।
তেহরানে ভয়াবহ রাতের হামলা
মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত তেহরানের আকাশে নিচু দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বোমা ফেলা হয়, যার বিস্ফোরণে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। প্রায় এক কোটির বেশি মানুষের এই মহানগরে বাসিন্দারা ঘরের ভেতরেই আতঙ্কে রাত কাটান।
অনেকেই জানিয়েছেন, প্রথমে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে টানা যুদ্ধবিমান মাথার ওপর দিয়ে উড়ে বোমা ফেলতে থাকে। এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে আবার হামলা চালানো হয়।
পশ্চিম তেহরানের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী সিমা বলেন, প্রথমে মনে হচ্ছিল ডজনখানেক যুদ্ধবিমান আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ছে। এরপর বিরতি দিয়ে আবার হামলা শুরু হয়।
তিনি বলেন, মাটি, জানালা—সবকিছু কাঁপছিল। আমাদের হৃদয়ও কাঁপছিল। আমরা বাথরুমে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে রাত পার করেছি।

রাতকে দিনের মতো আলোকিত করে বিস্ফোরণ
তেহরানের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ভোরে শক্তিশালী বিমান হামলার সময় আকাশে তীব্র আলোর ঝলকানি দেখা যায়। মুহূর্তের জন্য রাত যেন দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
কিছু মানুষ ছাদ বা বারান্দায় উঠে বিস্ফোরণের দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে নীল রঙের অদ্ভুত আলোও দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে এমন আলো তৈরি হয়েছিল।
কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলেও সরকার জানিয়েছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
তেহরানের বাইরে অন্যান্য শহরেও হামলা
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান ছাড়াও ইসফাহান ও কারাজ শহরেও হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, মঙ্গলবার ইরানের ভেতরে হামলার দিক থেকে সবচেয়ে তীব্র দিন হতে যাচ্ছে।

আশ্রয়কেন্দ্র নেই, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে মানুষ
তেহরানের মধ্যাঞ্চলে বসবাসকারী ২৫ বছর বয়সী আলিরেজা বলেন, জরুরি পরিস্থিতির জন্য তিনি তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলা রেখেছিলেন, যাতে দ্রুত নিচতলার পার্কিংয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে পারেন।
তিনি বলেন, তেহরানে কোনো সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নেই।
তিনি জানান, শহরের বিভিন্ন জায়গায় কী ঘটছে তা জানতে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে বারবার ফোন ও বার্তা বিনিময় করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
দেশজুড়ে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ
ইরান সরকার টানা ১১ দিন ধরে প্রায় পুরো দেশেই ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে। এখন শুধু স্থানীয় কিছু অনলাইন সেবা চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার।
ভিপিএন ও প্রক্সি সংযোগ কালোবাজারে বিক্রি হলেও সরকার সেগুলো দ্রুত শনাক্ত করে বন্ধ করে দিচ্ছে। এসব সংযোগের দামও অনেক বেশি, গতি ধীর এবং ডেটার সীমা খুব কম।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানে যে ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে তা বিশ্বে সরকারি নির্দেশে আরোপিত সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞাগুলোর একটি।
সরকার জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা বহাল থাকবে।
ভিডিও পাঠালে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি
সরকারি অনুমতি ছাড়া যুদ্ধের ভিডিও ধারণ বা বিদেশি গণমাধ্যমে পাঠানো হলে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিচার বিভাগ।
তেহরান ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের আধাসামরিক বাহিনী বসিজ চেকপোস্ট স্থাপন করেছে।
বিচার বিভাগের মুখপাত্র আসগর জাহাঙ্গির বলেছেন, কেউ যদি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
বিদেশে থাকা সরকারবিরোধী ইরানিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার কথাও জানিয়েছে সরকার।
যুদ্ধের মাঝেও চলছে সীমিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম
যুদ্ধের মধ্যেও তেহরানের কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে দোকানপাট খোলা রয়েছে। কিছু ট্যাক্সিচালক ও মোটরসাইকেল কুরিয়ার জীবিকার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজধানীর গ্র্যান্ড বাজারের এক দোকানকর্মী জানান, তারা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দোকান খোলা রাখছেন, তবে ক্রেতা খুব কম।
তিনি বলেন, তার আত্মীয়রা খুব ছোট দূরত্বে যাতায়াত করছেন। কারণ পূর্ব তেহরানের অনেক নিরাপত্তা ও পুলিশ স্থাপনায় সম্প্রতি একাধিকবার বোমা হামলা হয়েছে।
জ্বালানি স্থাপনায় হামলার প্রভাব
রবিবার রাতে তেহরানের বড় জ্বালানি মজুত কেন্দ্র ও তেল স্থাপনায় হামলার ফলে সোমবার আকাশ কালো হয়ে যায়। তেলের কণায় ভারী দূষিত বৃষ্টিও হয়েছে।
এরপর অনেক গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্রেও ভিড় দেখা যায়।
বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বহু আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তারা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপও দাবি করেছে।

নওরোজের আগে জরুরি আমদানির পরিকল্পনা
২০ মার্চ ইরানি নববর্ষ নওরোজের আগে খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির চেষ্টা করছে সরকার।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পণ্য বিনিময়সহ জরুরি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব পণ্য আনার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনাও আপাতত বন্ধ বলে জানিয়েছে সরকার।
অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর
দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছে।
বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি চলছে। খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ায় সাধারণ মানুষ তীব্র সংকটে পড়েছেন।
সাইবার হামলাও প্রতিহত করার দাবি
যুদ্ধ চলাকালে বড় ধরনের সাইবার হামলাও প্রতিহত করার দাবি করেছে ইরান।
গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের সময়ও দুইটি বড় ব্যাংক এবং দেশের প্রধান ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ সাইবার হামলার লক্ষ্য হয়েছিল।
মঙ্গলবার ভোরে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক মেল্লি ও ব্যাংক সেপাহর সেবায় স্বল্প সময়ের জন্য বিঘ্ন ঘটলেও দ্রুত তা ঠিক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















