মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনায় তার মন্তব্য ও পরবর্তী ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, নাকি পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই মন্তব্য করেছিলেন।
স্কুলে হামলা নিয়ে ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর মন্তব্য
শনিবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধের শুরুতে তেহরান নিজেই একটি ইরানি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা চালিয়েছিল, যাতে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্বীকার করেন যে বিষয়টি নিয়ে তিনি যথেষ্ট জানতেন না।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসনের অন্য কেউ কেন একই দাবি করেননি তার কারণ হলো তিনি নিজেই ঘটনাটি সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য জানতেন না। তিনি আরও বলেন, তদন্তের ফলাফলকে তিনি সম্মান করবেন।
এই মন্তব্য আরও বিস্ময় তৈরি করেছে কারণ ওই হামলাটি ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও প্রমাণের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে, হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের হতে পারে। নতুন ভিডিওতেও দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের পাশে থাকা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর যুদ্ধ অংশগ্রহণ নিয়ে ভুল দাবি
একই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে তেহরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, প্রথমে তারা নিরপেক্ষ ছিল, কিন্তু হামলার পর তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। তিনি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের নামও উল্লেখ করেন।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। ইরান অবশ্যই এসব দেশের ভেতরে থাকা মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে, কিন্তু তার ফলে ওই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়নি।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়লেও এখন পর্যন্ত তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলা চালায়নি। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে এবং বর্তমানে অন্য কূটনৈতিক উপায়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে।
সৌদি আরব ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছে যে হামলা অব্যাহত থাকলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
কাতারও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা ইরানকে লক্ষ্য করে কোনো সামরিক অভিযানের অংশ নয় এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তেল সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে মন্তব্য
ট্রাম্প একই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীর হয়ে গেলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে না, কারণ দেশটি এখন নিজস্ব তেল উৎপাদনে সক্ষম।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশের বাজারে পড়ে। ইতোমধ্যে তেলের দামের ওঠানামা বিশ্ববাজারে প্রভাব ফেলছে।
ইরানের সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, ইরান খুব শিগগিরই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারত যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। তিনি আরও বলেছেন, ইরান নাকি আগাম হামলার পরিকল্পনা করছিল এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য গোয়েন্দা তথ্য সামনে আসেনি। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ট্রাম্পের এসব বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যুদ্ধের সময় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের প্রশ্ন
সমালোচকদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়া এক বিষয়, কিন্তু একটি অতি স্পর্শকাতর যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাস্তব তথ্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করা ভিন্ন বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের মতো অস্থির অঞ্চলে যুদ্ধ চলাকালে নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ট্রাম্পের বক্তব্য অনেক সময় বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—যুদ্ধ পরিচালনার মতো গুরুতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব কতটা তথ্যনির্ভর অবস্থানে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















