কানাডার টরন্টো শহরের উপশহর মিসিসাগায় একসময়ের শান্ত এলাকাকে বদলে দিয়েছে একটি বিশাল খাবারের কেন্দ্র। ‘রিজওয়ে প্লাজা’ নামের এই স্ট্রিপ মার্কেট এখন উত্তর আমেরিকার অন্যতম বড় হালাল খাবারের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। হাজারো মানুষ প্রতিদিন এখানে খাবারের সন্ধানে ভিড় জমালেও এর জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে যানজট, শব্দদূষণ ও প্রতিবেশীদের অসন্তোষ।
শান্ত উপশহর থেকে রাতজাগা খাবারের কেন্দ্র
মিসিসাগার শহরতলির যেখানে বাড়িঘর ধীরে ধীরে কৃষিজমির সঙ্গে মিশে গেছে, সেই এলাকায় কয়েক বছর আগেও ছিল নীরব পরিবেশ। কিন্তু মাত্র তিন বছরে রিজওয়ে প্লাজা সেখানে গড়ে তুলেছে এক নতুন খাদ্যসংস্কৃতির কেন্দ্র।
বর্তমানে এই প্লাজায় প্রায় ১২০টির মতো রেস্তোরাঁ রয়েছে। এর অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার খাবার পরিবেশন করে। নিজেদের দাবি অনুযায়ী এটি উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় হালাল খাবারের বাজার। প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ এখানে খাবার খেতে আসেন, অনেকেই টরন্টোর বাইরের শহর কিংবা যুক্তরাষ্ট্র থেকেও আসেন।
শীতের কনকনে হাওয়া থেকে বাঁচতে মানুষ দ্রুত রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়ে, পার্কিং লটে গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যায়, আর নানারঙা ডিজিটাল সাইনবোর্ডের আলোয় ভরে ওঠে পুরো এলাকা। দৃশ্যটি যেন শহরের কেন্দ্র নয়, বরং উপশহরের মাঝেই তৈরি হয়েছে এক ব্যস্ত রাতের খাবারপাড়া।

বৈচিত্র্যময় খাবারেই জনপ্রিয়তা
এই প্লাজার প্রধান আকর্ষণ খাবারের বৈচিত্র্য। এখানে পাওয়া যায় পাকিস্তানি ঝোলজাতীয় খাবার, ফিলিস্তিনি মিষ্টান্ন কনাফা, ইয়েমেনি কফি, ভারতীয় জিলাপি, আবার একইসঙ্গে মেক্সিকান টাকো, চীনা নুডলস কিংবা আমেরিকান বার্গারও।
কিছু রেস্তোরাঁ প্রায় সারারাত খোলা থাকে। একটি বারবিকিউ দোকান শুধু সকাল ছয়টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। রমজান মাসে একটি পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে সেহরির সময় মানুষ খাবার পায়।
অনেক দর্শনার্থীর মতে, এত বৈচিত্র্যময় খাবার এক জায়গায় পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর। কেউ কেউ ৮০ কিলোমিটার দূর থেকেও এখানে খাবার খেতে আসেন।
জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাড়ছে সমস্যাও
তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছে নানা অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দিনরাত গাড়ির ভিড়, শব্দদূষণ, ময়লা ফেলা এবং পার্কিং সংকট এলাকাটিকে অস্বস্তিকর করে তুলেছে।
কখনও কখনও গাড়িপ্রেমীদের জমায়েত থেকে উচ্চ শব্দে ইঞ্জিন চালানো, অবৈধ আতশবাজি কিংবা রাস্তার দৌড় প্রতিযোগিতার মতো ঘটনাও ঘটে। এমনকি কয়েকবার সংঘর্ষ ও পুলিশের ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অনেক দীর্ঘদিনের বাসিন্দা বলছেন, কয়েক বছর আগেও ভোর তিনটায় এই এলাকায় গাড়ি চলাচল ছিল কল্পনাতীত। এখন প্রায়ই গভীর রাতেও শব্দে ঘুম ভেঙে যায়।
অভিবাসন ও সামাজিক উত্তেজনার প্রভাব
মিসিসাগার জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে অভিবাসীদের আগমনের কারণে। একই সময়ে কানাডার কিছু অংশে নতুন অভিবাসীদের নিয়ে জনমতও কঠোর হয়েছে।
কিছু বড় সাংস্কৃতিক দিবস যেমন পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবস কিংবা ইরাক জাতীয় দিবস উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত হয়েছে এই প্লাজায়। এতে শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সেবার কাজে সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
ব্যবসায়ীদের আশা ও উদ্বেগ
প্লাজার অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, এই জায়গা এখন পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তবে কিছু দর্শনার্থীর আচরণ নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
তাদের মতে, যদি বিশৃঙ্খলার বদনাম বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে দর্শনার্থীর আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই ব্যবসায়ীরা এখন শহর প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন।
শহর প্রশাসনের পদক্ষেপ
অতিরিক্ত ভিড় ও সমস্যার কারণে শহর কর্তৃপক্ষ নতুন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা চালু করেছে। নতুন ব্যবসা যেন পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হতে না পারে, সে জন্য অস্থায়ী নিয়মও প্রয়োগ করা হয়েছে।
প্লাজার মালিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বড় অঙ্কের জরিমানা করা হয়েছে, বিশেষ করে আতশবাজি ও উচ্চ শব্দে সংগীত বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে।
বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ
কিছু বাসিন্দা পরিস্থিতিতে এতটাই বিরক্ত যে তারা এলাকা ছেড়েও চলে গেছেন। একজন প্রতিবেশীর ভাষায়, এখন নিজের বাড়ির পেছনের উঠোনেও শান্তিতে বসা যায় না।
তবু সমালোচনার মাঝেও রিজওয়ে প্লাজা অনেকের কাছে প্রাণবন্ত এক খাবারের গন্তব্য। রাত গভীর হলেও এখানে মানুষের আনাগোনা, আলো আর খাবারের গন্ধ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভিন্নধর্মী নগর সংস্কৃতি।
Sarakhon Report 



















