যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র বোমা হামলার পরও ইরানের সরকার এখনো মূলত অটুট রয়েছে এবং শিগগিরই তা ভেঙে পড়ার কোনো ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে না।
গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের বিশ্লেষণ উঠে এসেছে—ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং দেশটির জনগণের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় আছে।
একজন সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিকতম গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ১১ মার্চের কয়েক দিন আগেই প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই।
নেতৃত্বে সংহতি বজায়
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। তবে তার মৃত্যুর পরও দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে শক্ত সংহতি বজায় রয়েছে বলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ সম্প্রতি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
মাঠের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত
গোয়েন্দা সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, ইরানের ভেতরের পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক গতিপ্রকৃতি তৈরি হতে পারে।
একই ধরনের মূল্যায়ন ইসরায়েলের ভেতরেও শোনা যাচ্ছে। এক সিনিয়র ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ইরানের ধর্মীয় সরকারকে পতনের দিকে ঠেলে দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
হোয়াইট হাউস বা যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরের দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সিআইএও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা।
এই হামলায় ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) শীর্ষ পর্যায়ের বহু কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি ইরানের একটি শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী, যা দেশের অর্থনীতির বড় অংশের ওপরও প্রভাব রাখে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি এবং খামেনির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব এখনো দেশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তি
যুদ্ধ শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকার উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য ইরানের সরকারকে সরিয়ে দেওয়া নয়।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ২০০৩ সালের পর সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক অভিযানের সমাপ্তি তিনি শিগগিরই ঘোষণা করতে পারেন।
তবে ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব যদি ক্ষমতায় দৃঢ়ভাবে টিকে থাকে, তাহলে যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
স্থল অভিযান ছাড়া পরিবর্তন কঠিন
একটি সূত্রের মতে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলা একাই ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। সরকার পতন ঘটাতে হলে সম্ভবত স্থল অভিযান প্রয়োজন হবে।
এ ধরনের অভিযান হলে ইরানের জনগণ রাস্তায় নেমে নিরাপদে বিক্ষোভ করতে পারবে, যা সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো ইরানে মার্কিন সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেনি।
কুর্দি গোষ্ঠীর পরিকল্পনা
গত সপ্তাহে রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি মিলিশিয়ারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করেছে—ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে।
এ ধরনের হামলা ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইরানি কুর্দিস্তানের কোমালা পার্টির নেতা আবদুল্লাহ মোহতাদি ১১ মার্চ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাদের সংগঠন ইরানের ভেতরে শক্তভাবে সংগঠিত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেলে “দশ হাজারের বেশি তরুণ অস্ত্র তুলে নিতে প্রস্তুত।”
তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ভয়ে কুর্দি অঞ্চলের কিছু ঘাঁটি ও ব্যারাক থেকে আইআরজিসি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সরে গেছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্রশক্তি ও জনবল নেই, যা দিয়ে তারা দীর্ঘ সময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
অস্ত্র সহায়তার আবেদন
সাম্প্রতিক দিনে ইরানি কুর্দি সংগঠনগুলো ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের কাছে অস্ত্র ও সাঁজোয়া যান সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
কিন্তু ৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের ভেতরে অভিযান চালানোর অনুমতি দেবেন না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















