লন্ডনের এক উজ্জ্বল সকালে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘদেহী অভিনেতা জন লিথগো। মাথায় গাঢ় টুপি, মুখে সহজ হাসি। পথচারীরা পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাকাচ্ছেন—কেউ চিনে ফেলছেন তাকে, কেউ আবার ভাবছেন কোথায় যেন দেখেছেন এই মানুষটিকে। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে তিনি এত বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন যে দর্শকের মনে তার একাধিক পরিচয়। কখনও রহস্যময় খুনি, কখনও ক্ষমতাধর রাজনীতিক, আবার কখনও হাস্যরসাত্মক চরিত্র।
এবার তিনি হাজির হচ্ছেন এক ভিন্ন ভূমিকায়—বিশ্বখ্যাত শিশু সাহিত্যিক রোয়াল্ড ডালকে কেন্দ্র করে তৈরি নতুন নাটকে। নাটকের নাম ‘জায়ান্ট’। এই চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে লিথগো তুলে ধরছেন এক প্রতিভাবান অথচ বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের গল্প।
মঞ্চে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক জটিল মানুষ
রোয়াল্ড ডাল শিশু সাহিত্যজগতে এক কিংবদন্তি নাম। তার গল্পে ছিল অদ্ভুত কল্পনা, দুষ্টুমি ভরা হাস্যরস এবং অপ্রত্যাশিত মোড়। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ও মন্তব্য নিয়ে বহু বিতর্কও রয়েছে।

নতুন এই নাটকে ডালকে দেখানো হয়েছে একই সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত, আকর্ষণীয় এবং তীক্ষ্ণ মেজাজের একজন মানুষ হিসেবে। তার সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত ছিল বিতর্ক, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং তীব্র মতামত।
নাটকটির গল্প গড়ে উঠেছে একটি কল্পিত মধ্যাহ্নভোজের দৃশ্যকে ঘিরে। সেখানে প্রকাশক ও ঘনিষ্ঠজনেরা ডালকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন এক বিতর্কিত লেখা নিয়ে তৈরি হওয়া ঝড় সামাল দিতে। বাস্তব ঘটনার ছায়া থাকলেও নাটকটি মূলত মানুষের ব্যক্তিত্ব, পক্ষপাত ও শিল্পের সম্পর্ককে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
জন লিথগোর দীর্ঘ অভিনয়যাত্রা
জন লিথগো বহু দশক ধরে নাটক, সিনেমা ও টেলিভিশনে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন। কমেডি থেকে ভয়ংকর চরিত্র—সব ধরনের ভূমিকায় তিনি সমান স্বচ্ছন্দ।
তার সহশিল্পীরা বলেন, লিথগোর বড় শক্তি হলো চরিত্রের ভেতরে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা। তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেন, সেই পৃথিবীটাকেই নিজের বাস্তবতা বানিয়ে নেন।

এই নতুন নাটকের প্রস্তুতিতেও তিনি ডালের জীবনের নানা দিক নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করেছেন। তার মতে, ডালের জীবন ছিল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও ক্ষতির অভিজ্ঞতায় ভরা—যা তার চিন্তা ও লেখায় প্রভাব ফেলেছিল।
জীবনের শেষ অধ্যায়েও সৃষ্টির উচ্ছ্বাস
অভিনয়ের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও লিথগোর আগ্রহ কমেনি। বরং তিনি এখন নিজেকে দেখেন অভিজ্ঞ চরিত্রাভিনেতা হিসেবে, যিনি মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব তুলে ধরতে আগ্রহী।
তিনি মনে করেন, জীবনের শেষ দশক কীভাবে কাটাবেন তা এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তবু মঞ্চে নতুন চরিত্র পাওয়া মাত্রই তার চোখে জ্বলে ওঠে আগ্রহের ঝিলিক।

‘জায়ান্ট’ নাটকটি যখন প্রথম মঞ্চস্থ হয়, তখনই দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এখন এটি নতুন করে মঞ্চে আসছে, আর লিথগো নিজেও উচ্ছ্বসিত এই চরিত্রে আবার অভিনয় করতে। তার ভাষায়, এমন একটি চরিত্র যেন বড় মাছ ধরার মতো—একবার পেলে ছাড়তে মন চায় না।
শিল্প, বিতর্ক ও মানুষের গল্প
রোয়াল্ড ডালের জীবন নিয়ে এই নাটকটি আসলে একটি বড় প্রশ্ন তোলে—একজন শিল্পীর কাজকে কি তার ব্যক্তিগত মতামত থেকে আলাদা করে দেখা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে নাটকটি দেখায়, মানুষ একই সঙ্গে সৃজনশীল, উদার, ক্ষুব্ধ এবং বিতর্কিত হতে পারে। আর সেই দ্বৈততার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক আকর্ষণীয় মানবিক গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















