হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান সংঘাতে সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের কাছ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ পুরোপুরি দখল বা নিরাপদ রাখা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। প্রণালির পথ অত্যন্ত সরু হওয়ায় জাহাজগুলো ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট এবং ছোট নৌকার সমন্বিত হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে স্থায়ী সমাধান হিসেবে কূটনীতির পথই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে এসকর্ট দিয়ে প্রণালি পার করাতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, এ ধরনের অভিযান চালানোর মতো প্রস্তুতি এখনও সম্পূর্ণ নয়।

অসমমিত যুদ্ধের কৌশলে ইরান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শক্তিশালী হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ পর ইরান পাল্টা চাপ সৃষ্টি করার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছে—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত চেপে ধরা।
জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়া, ইরাকের একটি বন্দরে তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো এবং প্রণালিতে নৌমাইন বসানো শুরু করার মাধ্যমে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ফলে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের গতি কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল অবস্থায় থাকলেও ইরান দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ করা হবে—এই হিসাব আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক কেটলিন টালম্যাজ বলেন, এই যুদ্ধ শুধু বর্তমান সংঘাতের বিষয় নয়; ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা আবার প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ও এতে জড়িত।

ভূগোলই ইরানের বড় সুবিধা
পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানির প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি সবচেয়ে সরু স্থানে প্রায় ২০ মাইল প্রশস্ত এবং এটি ইরানের দক্ষিণ উপকূল ঘেঁষে গেছে।
এই ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে ইরান ছোট নৌকা, সাবমেরিন, মানববিহীন জলযান, নৌমাইন এবং স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার কৌশল নিতে পারে।
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীরা বহু বছর ধরেই এই সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রণালির সংকীর্ণ পথ এবং জাহাজের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানের কারণে হামলা পুরোপুরি ঠেকানো অত্যন্ত কঠিন।
মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস. ক্লিন্টন হাইনোটে বলেন, সামরিকভাবে পুরোপুরি নিরাপদ করতে হলে ইরানের সেই উপকূলীয় অঞ্চল দখল করে রাখতে হবে যেখান থেকে তারা হামলা চালাতে পারে। এর জন্য বিপুল সংখ্যক স্থলবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।
তার মতে, বাস্তবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সামরিক নয়, বরং কূটনৈতিক।
নৌবাহিনীর এসকর্ট পরিকল্পনা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেন, মার্কিন নৌবাহিনী ট্যাঙ্কারগুলোকে এসকর্ট দিয়ে প্রণালি পার করাতে পারে।
কিন্তু জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানান, এই ধরনের অভিযান চালানোর মতো প্রস্তুতি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তার ভাষায়, এটি শিগগিরই হতে পারে, কিন্তু এখনই সম্ভব নয়।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানান, এসকর্ট অভিযান শুরু করার আগে অন্তত আরও কয়েক দিন ইরানের সামরিক সক্ষমতার ওপর বিমান হামলা চালাতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে মাইন পাতা জাহাজ, নিয়মিত নৌবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দ্রুতগতির নৌকা এবং স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।
তারপরও বড় সমস্যা থেকে যাবে—বাণিজ্যিক জাহাজ কোম্পানিগুলোকে আবার এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে রাজি করানো।

জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
ইরানের কৌশল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলছে।
হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় অংশ এশিয়ায় যায়। ফলে এই অঞ্চলের অনেক দেশ জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
তবে ইরানের প্রধান ক্রেতা চীন সংঘাতের আগে থেকেই তেলের মজুত বাড়িয়ে রেখেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চীনের তেল আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কৌশলগত তেলের মজুত প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল, যা সমুদ্রপথে আমদানিকৃত তেলের প্রায় ১১৫ দিনের সমান।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ ডলার প্রতি ব্যারেল। বৃহস্পতিবার তা ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথমবার।
প্রণালিতে মাইন পাতা
ইরান যখন প্রণালিতে নৌমাইন পাতা শুরু করেছে, তখন ঝুঁকি আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, তারা ইতিমধ্যে বহু মাইন পাতা জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
তবে এখন ইরান ছোট নৌকা ব্যবহার করে মাইন বসানোর কৌশল নিচ্ছে, যেগুলোর সংখ্যা শত শত।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, প্রণালিতে মাইন পরিষ্কার করতে গেলে মার্কিন নৌবাহিনীকে কয়েক সপ্তাহব্যাপী অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে হতে পারে। এতে মার্কিন নাবিকরা সরাসরি বিপদের মুখে পড়বেন।
উপসাগরীয় রাজনীতিতে প্রভাব
এই সংকট যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্কের নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন কৌশল খুঁজতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব দেশ ভবিষ্যতে এই সমুদ্রপথের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথও ভাবতে পারে।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ব্রায়ান কাটুলিস বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বুঝতে শুরু করেছে যে হরমুজ প্রণালির জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার। তার মতে, এই অভিজ্ঞতার পর তারা নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো খুঁজতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















