পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মধ্যে ভারতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ব্যবহারের তথ্য নতুন এক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। যেসব রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগী বেশি—যা মূলত গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারকে লক্ষ্য করে চালু করা হয়েছে—সেসব রাজ্যে মোট এলপিজি ব্যবহার বেশি হলেও প্রতি পরিবারে গড় ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, শহরভিত্তিক রাজ্য বা অঞ্চলে প্রতি পরিবারে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ অনেক বেশি।
তিন দশকে এলপিজি ব্যবহারের ছয় গুণ বৃদ্ধি
কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পেট্রোলিয়াম পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ সেল (পিপিএসি)–এর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে ভারতে এলপিজি ব্যবহারে বিশাল বৃদ্ধি হয়েছে।
১৯৯৮–৯৯ অর্থবছরে যেখানে মোট এলপিজি ব্যবহার ছিল ৪৪৬ হাজার মেট্রিক টন, সেখানে ২০২৫–২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৭৫৪ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ এই সময়ে ব্যবহার প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।
বিশেষ করে ২০০০ এবং ২০১০ দশকে এলপিজি ব্যবহারের বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ, যা বছরে প্রায় ৮ থেকে ১১ শতাংশের মধ্যে ছিল।
উজ্জ্বলা যোজনার পর ব্যবহার বৃদ্ধি
২০১৬–১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা চালুর পর এলপিজি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যায়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে গ্যাস সংযোগ এবং ভর্তুকিযুক্ত সিলিন্ডার দেওয়া হয়।
এই কর্মসূচি চালুর পর ওই বছরই এলপিজি ব্যবহারের বৃদ্ধির হার ছিল ১০.১ শতাংশ। তবে ২০২০ সালের পর থেকে নতুন সংযোগ প্রায় পূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে ব্যবহারের বৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে যায়।
গ্রামীণ পরিবারে গ্যাসের গ্রহণযোগ্যতা
আগে গ্রামীণ পরিবারগুলো রান্নার জন্য প্রধানত জ্বালানি কাঠ বা পশুর গোবরের মতো ঐতিহ্যবাহী জ্বালানির ওপর নির্ভর করত। উজ্জ্বলা প্রকল্প চালুর পর এলপিজি রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়।
লোকসভায় দেওয়া এক উত্তরে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামীণ পরিবার।
বর্তমানে ভারতে মোট এলপিজি গ্রাহকের সংখ্যা ৩৩.৩৭ কোটি। এর মধ্যে ১০.৫৬ কোটি সংযোগ উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় দেওয়া হয়েছে।
কোন রাজ্যে এলপিজি গ্রাহক বেশি
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পিপিএসি–র তথ্য অনুযায়ী, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ও গ্রামীণ রাজ্যগুলোতেই এলপিজি গ্রাহকের সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় এসব রাজ্যে বিপুল সংখ্যক সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং মোট এলপিজি ব্যবহারও সেখানে বেশি।
উত্তর প্রদেশে রয়েছে দেশের সর্বাধিক এলপিজি গ্রাহক। সেখানে মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪.৮৭ কোটি, যার মধ্যে ১.৮৮ কোটি উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগী। এটি দেশের মোট এলপিজি গ্রাহকের প্রায় ১৫ শতাংশ।
এর পরেই রয়েছে মহারাষ্ট্রে ৩.২ কোটি, পশ্চিমবঙ্গে ২.৭২ কোটি, তামিলনাড়ুতে ২.৪ কোটি, বিহারে ২.৩৩ কোটি এবং কর্ণাটকে ১.৯ কোটি গ্রাহক।
উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধাভোগীর সংখ্যায় উত্তর প্রদেশের পরেই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১.২৪ কোটি। এরপর রয়েছে বিহার ১.১৮ কোটি, মধ্যপ্রদেশ ৮৯ লাখ এবং রাজস্থান ৭৪.৩ লাখ।
গ্রামীণ জনসংখ্যা ও গ্যাস ব্যবহার
এই রাজ্যগুলোর বেশিরভাগ জনগণই গ্রামে বাস করে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতে মোট জনসংখ্যার ৬৯.৮ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় বাস করে।
কিন্তু উত্তর প্রদেশে এই হার ৭৭.৭ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ৬৮.১ শতাংশ, বিহারে ৮৮.৭ শতাংশ, মধ্যপ্রদেশে ৭২.৪ শতাংশ এবং রাজস্থানে ৭৫.১ শতাংশ।
প্রতি পরিবারে গ্যাস ব্যবহারের বড় পার্থক্য
প্রতি পরিবারের গড় মাসিক এলপিজি ব্যবহারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শহুরে এলাকায় গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ গ্রামীণ এলাকার তুলনায় অনেক বেশি।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রধানত শহরভিত্তিক দিল্লিতে একটি পরিবার মাসে গড়ে ১১.৪ কেজি এলপিজি ব্যবহার করে।
অন্যদিকে, অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে এমন বিহারে প্রতি পরিবারের মাসিক গড় ব্যবহার মাত্র ৬.৭ কেজি। উত্তর প্রদেশে তা ৭.৭ কেজি। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই একটি পরিবার মাসে অর্ধেক সিলিন্ডারেরও কম গ্যাস ব্যবহার করছে।
সংযোগ থাকলেও ব্যবহার সীমিত
এই প্রবণতার সঙ্গে উজ্জ্বলা যোজনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু এই প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ সুবিধাভোগী গ্রামীণ পরিবার, তাই সংযোগ থাকলেও অনেক পরিবার সিলিন্ডার দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করছে অথবা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করছে।
উদাহরণ হিসেবে বিহারের মতো গ্রামীণ রাজ্য এবং দিল্লির মতো শহুরে অঞ্চলের তুলনা করলে দেখা যায়, গ্রামে গ্যাস সংযোগ থাকলেও অনেক পরিবার একটিমাত্র সিলিন্ডার দীর্ঘ সময় ব্যবহার করে অথবা কাঠ ও অন্যান্য জ্বালানির সাহায্যে রান্না করে।
অন্যদিকে শহরের পরিবারগুলো প্রায় পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল এবং তাই তাদের ব্যবহার অনেক বেশি।
আয়ের সঙ্গে গ্যাস ব্যবহারের সম্পর্ক
প্রতি পরিবারের গড় গ্যাস ব্যবহারের সঙ্গে মাথাপিছু আয়েরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ রাজ্যের পরিবারগুলো দরিদ্র রাজ্যের তুলনায় বেশি এলপিজি ব্যবহার করে।
ফলে দেখা যায়, অনেক গ্রামীণ রাজ্যে মোট এলপিজি ব্যবহার বেশি হলেও প্রতি পরিবারের গড় ব্যবহার কম।
উদাহরণ হিসেবে উত্তর প্রদেশে মাসে গড়ে ৩৭৭.৪ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি ব্যবহার হয়—যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু প্রতি পরিবারের গড় মাসিক ব্যবহারের হিসেবে এই রাজ্যের অবস্থান দেশের মধ্যে ২২তম।
একই চিত্র দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যেও। এসব রাজ্যে মোট এলপিজি ব্যবহার অনেক বেশি হলেও প্রতি পরিবারের গড় ব্যবহার দেশের সর্বনিম্নের মধ্যে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















