মধ্যপ্রদেশের ভোপাল থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দূরে বারখেড়া গ্রামে ভোর হওয়ার আগেই ঘর ছাড়েন শোয়েব। হাতে থাকে কুড়াল আর দড়ি। গন্তব্য কাছের বন। সেখানে যেতে হয় অত্যন্ত সতর্ক হয়ে, কারণ ওই বনেই ঘুরে বেড়ায় বাঘ। তবু তিনি যান। কারণ গ্রামে হঠাৎ বেড়ে গেছে জ্বালানি কাঠের চাহিদা।
বন থেকে কাঠ কাটার অভিযোগে ইতিমধ্যে চারবার মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবু থামেননি। কারণ আগে যেসব গ্যাস সিলিন্ডার বাড়িতে পৌঁছে যেত, সেগুলোর সরবরাহ এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
শোয়েব বলেন, এই গ্রামের মানুষ যেন পাঁচ বছর পিছিয়ে গেছে। সবাই এখন আবার কাঠের ওপর নির্ভর করছে। ১৯টি কাঠের গুঁড়ির দাম এখন ৭০০ রুপি। মানুষ কিনছে, আর আমি সেই চাহিদা মেটাতে বাঘ আর বনবিভাগের ঝুঁকি নিচ্ছি।
উজ্জ্বলা প্রকল্পের পর বদলে গিয়েছিল জীবন
বারখেড়া গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। নিকটতম এলপিজি এজেন্সি এখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। পাঁচ বছর আগে এই গ্রামটি প্রধানমন্ত্রীর উজ্জ্বলা যোজনার আওতায় আসে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ পরিবারগুলোকে রান্নার গ্যাস সংযোগ দেওয়া।
এর ফলে বড় পরিবর্তন আসে। বহু পরিবার কাঠের চুলা ছেড়ে গ্যাসে রান্না শুরু করে। কিন্তু সাম্প্রতিক এলপিজি সংকট সেই পরিবর্তনকে আবার উল্টে দিয়েছে।
এখন আর আগের মতো সিলিন্ডার বাড়িতে পৌঁছায় না। যেসব ডেলিভারি কর্মীরা নিয়মিত ট্রাকে করে সিলিন্ডার এনে দিতেন, তারা এখন ফোনও ধরছেন না। কোথাও কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০০ থেকে ১৪০০ রুপি।
এলপিজি সংকটের পেছনে বৈশ্বিক উত্তেজনা
মধ্যপ্রদেশজুড়ে এলপিজি সংকট ধীরে ধীরে এক নীরব সংকটে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে রান্নার গ্যাসের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ভোপাল, ইন্দোর এবং উজ্জয়িনীতে গ্যাস এজেন্সির সামনে মানুষকে ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও খালি সিলিন্ডার রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদও হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার জেলা প্রশাসকদের গ্যাসের মজুত নজরদারির নির্দেশ দিয়েছে এবং কালোবাজারি ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো সমস্যা নেই এবং মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন
সরকার আশ্বস্ত করলেও বারখেড়া গ্রামের মানুষ সেই আশ্বাস পাচ্ছেন না। তাদের কাছে গ্যাস সিলিন্ডার প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফলে আবার বনই হয়ে উঠেছে প্রধান জ্বালানির উৎস।
গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ ট্রাকচালক। তারা জাতীয় মহাসড়ক ধরে দূরদূরান্তে পণ্য পরিবহন করেন এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ির বাইরে থাকেন। ফলে সংসারের দায়িত্ব থাকে নারীদের ওপরই।
গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সমাধান খুঁজে বের করার দায়িত্বও তাদেরই নিতে হয়েছে।
নারীদের কাঁধে নতুন বোঝা
মথরা বাই প্রতিদিন সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বের হন। তিনি গভীর বনে যান না, বরং বনের কিনারায় কাঠ খুঁজে বেড়ান, যেখানে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। সারাদিন ঘুরে তিনি প্রায় পাঁচ কেজি কাঠ সংগ্রহ করেন এবং নিজেই তা বাড়ি বয়ে নিয়ে আসেন।
তিনি বলেন, পাঁচ কেজি কাঠে এক সপ্তাহ চলে যায়। তবে যদি পরিবারের ছয়জনের জন্য রান্না করতে হয়, তাহলে তা দুদিনেই শেষ হয়ে যায়।
বাঘের ভয়ে বনে যেতে পারছেন না অনেকে
গ্রামের প্রান্তে বসবাস করা প্রায় ৪৫টি আদিবাসী পরিবারের জন্য এই সংকট আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
মীনা উইকেয়ি নয় দিন আগে একটি গ্যাস সিলিন্ডার বুক করেছেন। তাকে একটি টোকেন দিয়ে বলা হয়েছে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে। ফলে তিনি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাস ছাড়া আছেন।
এখন তিনি দিনে একবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের পুরুষরা বাড়িতে নেই। আর তিনি নিজে বনে যেতে পারছেন না।
তিনি বলেন, আমি যদি খাবারের জন্য বনে যাই, তাহলে হয়তো আমিই বাঘের খাবার হয়ে যাব।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি আরও বলেন, আমরা বৃদ্ধা নারী, বাড়িতে কোনো পুরুষ নেই। যদি আমাদের কিছু হয়, তখন লাশ তোলার লোকও থাকবে না।
বনবিভাগের দাবি, পর্যাপ্ত মজুত আছে
রায়সেন জেলার বন কর্মকর্তা প্রতিভা শুক্লা জানান, বনবিভাগ বিষয়টি নিয়ে আগেই গবেষণা করেছে। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে আমরা গবেষণা করেছি কেন গ্রামবাসীরা অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ করেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমরা অতিরিক্ত মজুত রেখেছি। বর্তমানে আমাদের এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারের কোনো ঘাটতি নেই।
তবে বনবিভাগের আরেক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, এই অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের সংস্কৃতি রয়েছে। উজ্জ্বলা প্রকল্প চালুর পর তা কমে গিয়েছিল। এখন আবার সেই প্রবণতা ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা গ্রামবাসীদের আশ্বস্ত করছি যে এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক আছে এবং এই সংকট সাময়িক। সবাইকে বন এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিয়ে মৌসুমেও পড়েছে প্রভাব
গ্রামীণ মধ্যপ্রদেশে বসন্তের সময় বিয়ের মৌসুম শুরু হয়। ফসল কাটার পর মানুষের হাতে টাকা থাকে এবং উৎসবের আবহ তৈরি হয়। গ্রামজুড়ে তখন গাঁদা ফুলের সাজ, ঢোলের শব্দ আর সারারাত রান্নার ব্যস্ততা দেখা যায়।
এই সময় শত শত অতিথির জন্য অস্থায়ী রান্নাঘরে বিপুল পরিমাণ ভাত, ডাল ও হালুয়া রান্না হয়।
কিন্তু এ বছর সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। ক্যাটারার আমজাদ আলি জানান, এবার বিয়ের মৌসুমে তিনি একটি কাজও পাননি। অনেক পরিবার অতিথির তালিকা ১৫০ থেকে কমিয়ে ৫০ জনে নামিয়ে এনেছে।
তিনি বলেন, যদি এই সংকট আরও কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকে, তাহলে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো বড় ধাক্কা খাবে। এমনকি আমার নিজের বাড়িতেও এখন কোনো গ্যাস সিলিন্ডার নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















