ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলার মধ্যে তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ। ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে অন্তত আরও তিন সপ্তাহের সামরিক অভিযানের বিস্তারিত পরিকল্পনা তাদের হাতে রয়েছে। একই সময়ে ইরানের ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুবাই বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে, তেলের বাজারে অস্থিরতা
সোমবার ইসরায়েল জানায়, তারা ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় রাতভর হামলা চালিয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে এবং দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের তিন সপ্তাহের সামরিক পরিকল্পনা
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে অন্তত তিন সপ্তাহের বিস্তারিত সামরিক পরিকল্পনা তাদের প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলের জন্য সম্ভাব্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এমন ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন অংশকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
শোশানি জানান, ইরানের ভেতরে এখনও হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু রয়েছে যেগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরান এখন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির জন্য কোনো আবেদন করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বার্তা বিনিময়ও হয়নি।
ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও হতাহতের খবর
ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, মধ্য ইরানের মার্কাজি প্রদেশে রাতভর হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন। আরাক শহরের উপকণ্ঠে একটি আবাসিক এলাকায় এবং মাহাল্লাত অঞ্চলের একটি ভবনে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
একই প্রদেশের খোমেইন শহরে একটি ছেলেদের স্কুলও লক্ষ্যবস্তু হয়, যদিও সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং এগুলোকে তারা “ইরানি সন্ত্রাসী শাসনের অবকাঠামো” বলে উল্লেখ করেছে।
তেহরানে একটি ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় ইরানের রেড ক্রিসেন্টের এক কর্মী জানান, এটি পুরোপুরি আবাসিক এলাকা ছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষকে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছিল।
ফার্স সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শহীদ স্কয়ারের কাছে একটি হামলায় কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধের মাঝেও সাধারণ মানুষের আতঙ্ক
তেহরানের ৬২ বছর বয়সী এক নারী শাহনাজ বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপের মাধ্যমে জানান, রাতভর ইন্টারনেট বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। মানুষ মারা যাচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই নওরোজ উৎসব, কিন্তু কেউই উদযাপনের মুডে নেই। এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে?”
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে তার নাতনি নিহত হয়েছে এবং তিনি বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন দেন না।
ইরানের পাল্টা হামলা
ইসরায়েলে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কতা সাইরেন বাজতে শোনা যায়। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা তেল আবিবের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে।
এ ছাড়া আবুধাবির আল-ধাফরা মার্কিন ঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন নৌঘাঁটি এবং বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা ও বিমান চলাচল বন্ধ
ইরানের একটি ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের একটি তেল স্থাপনায় আঘাত হানে। এর ফলে তেল লোডিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এই বন্দরটি আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ মুরবান অপরিশোধিত তেল রপ্তানির একটি প্রধান পথ, যা বিশ্বব্যাপী তেলের মোট চাহিদার প্রায় এক শতাংশের সমান।
ড্রোন হামলায় কাছাকাছি একটি জ্বালানি সংরক্ষণাগারে আগুন লাগার পর দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হয়। আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
একই সময়ে সৌদি আরব জানিয়েছে, তাদের পূর্বাঞ্চলে এক ঘণ্টার মধ্যে ৩৪টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের চাপ, মিত্রদের সতর্ক অবস্থান
তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে। কারণ বছরের শেষে দেশটিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ন্যাটোর সদস্যরা যদি যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা না করে তবে জোটের ভবিষ্যৎ “খুব খারাপ” হতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ এই উদ্যোগে অংশ নেবে।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তার দেশ বৃহত্তর যুদ্ধে জড়াতে চায় না, যদিও মিত্রদের সঙ্গে মিলে সমুদ্রপথ পুনরায় চালু করার চেষ্টা করবে।
জাপান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালীতে নৌবাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা করছে না। অস্ট্রেলিয়াও জানায়, তারা নজরদারি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাতে পারে, কিন্তু নৌবাহিনী পাঠাবে না।
জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্তোরিয়াস স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে জার্মানি অংশ নেবে না।
চীনের সহায়তা না পেলে বৈঠক স্থগিতের ইঙ্গিত
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যদি চীন হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে সহায়তা না করে তবে চলতি মাসের শেষের দিকে নির্ধারিত চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক তিনি স্থগিত করতে পারেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে লজিস্টিক জটিলতা দেখা দিলে বৈঠকের সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
লেবানন ও গাজাতেও অভিযান
ইসরায়েল একই সঙ্গে লেবানন ও গাজাতেও হামলা অব্যাহত রেখেছে। সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর অবস্থানের বিরুদ্ধে সীমিত স্থল অভিযানও শুরু করেছে তারা।
Sarakhon Report 


















