ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক বাজার এক ঝড়ের মধ্যে দিকহারা হয়ে পড়েছে।
১৬ মার্চ দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি জ্বালানি ট্যাঙ্কে ড্রোন হামলার পর আগুন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্ব তার মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। জ্বালানির দাম আবার বাড়তে শুরু করায় ইউরো অঞ্চলে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে, আর যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবে সুদ কমানোর কোনো ইঙ্গিত নেই।
এই সংঘাতের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হলো জ্বালানি। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ হারিয়েছে, যা মোট সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এটি বৈশ্বিক তেলবাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা, যার ফলে দিনে একাধিকবার তেলের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে এবং বিপুল পরিমাণ কৌশলগত তেল মজুত ছাড়তে হয়েছে—যার কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই।
বর্তমান সংঘাতের প্রভাব বোঝার জন্য বিশ্লেষকেরা অতীতের তেল ও ভূরাজনৈতিক সংকটগুলো খতিয়ে দেখছেন। তবে সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে তাকালে হয়তো কিছু শিক্ষা ও আশ্বাস পাওয়া যেতে পারে, কীভাবে অর্থনীতি ও আর্থিক বাজার প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
প্রায় এক বছর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত কঠোর ‘মুক্তি দিবস’ শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বিশ্ব আরেকটি ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছিল। তখনও, এখনকার মতোই, এর উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তাৎক্ষণিক প্রভাবও ছিল একই রকম—সম্পদের দাম দ্রুত পড়ে যায়, স্বর্ণের দাম বাড়ে, ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ কমে যায়, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দেওয়া হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
কিন্তু এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল সমানভাবে বিস্ময়কর। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বৈশ্বিক শেয়ারবাজার বছরের শুরু তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে যায়। পুরো বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বছরের শুরুর প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে যায়।
মন্দার আশঙ্কার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। তীব্র আর্থিক অনিশ্চয়তা বছরের শেষে গিয়ে রূপ নেয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রযুক্তি খাত, বেসরকারি ঋণ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বাজারে অতিরিক্ত উত্তেজনায়।
এই নাটকীয় পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো—প্রযুক্তির উত্থানের ঢেউ শুল্কের প্রভাবকে ছাপিয়ে যায়, যার সঙ্গে বাড়তে থাকে ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ ও প্রবৃদ্ধি। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ইতিহাস কি আবারও নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে? ২০২৬ কি কেবল ২০২৫ সালের একটি তেল-নির্ভর সংস্করণ? আবার কি আমরা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ও বাজারের অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে বিস্মিত হব?

উত্তর হলো—না। এবারের ধাক্কা ও যুদ্ধ ২০২৫ সালের তুলনায় অনেক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে। ২০২৫ সালে মূল্যস্ফীতির চাপ কমছিল এবং বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমিয়ে শুল্কের প্রভাব সামাল দিতে পেরেছিল। কিন্তু এখন জ্বালানির দাম আবার বেড়ে যাওয়ায় সেই সুযোগ আর নেই। বাজারে ইউরো অঞ্চল ও ব্রিটেনে সুদের হার বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবে সুদ কমার সম্ভাবনা নেই।
আর্থিক বাজার এখন আশঙ্কা করছে, এই সংঘাত শেষ হলেও মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধিসহ সরকারি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক বন্ডের সুদও বেড়েছে—যা ২০২৫ সালের থেকে আলাদা। পুরো সুদের কাঠামো জুড়ে এই কঠোরতা বৈশ্বিক চাহিদাকে আরও সংকুচিত করবে।
এই কঠোরতা শুধু নিরাপদ বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক সপ্তাহে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা গেছে, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টো শেয়ারের মতো অতি উত্তেজিত সম্পদ এবং বেসরকারি ঋণ ও উচ্চ ঝুঁকির ঋণ বাজারে। এতে বিনিয়োগের মান ও মূল্যায়নের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। এই বাজারগুলোতে সহজ সময়ের অবসান ঘটেছে।
একই অবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রেও। নিরাপত্তার আশ্বাসে যেগুলো প্রতিভা ও পুঁজির আকর্ষণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের মর্যাদা এখন ভেঙে পড়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রও শীতল হয়ে পড়ছে, ঠিক যখন ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো উপসাগর-নির্ভর অর্থনীতিগুলোতেও গতি কমছে।
এদিকে পশ্চিমা বিশ্বে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে সমস্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে চাকরি হারানোর সংখ্যা বাড়ছে, যা ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে অনেক পরিবার আর্থিকভাবে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ছে, যখন তারা ২০২২ সালের পর থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামলাচ্ছে, তার ওপর আবার নতুন জ্বালানি-সংকটজনিত ব্যয় যোগ হচ্ছে।
২০২৫ সালের মতো কি আবার প্রযুক্তি খাত উদ্ধারকর্তা হতে পারবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি-নির্ভর। জ্বালানির দাম বেশি ও অনিশ্চিত হলে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা ধীর হয়ে যেতে পারে, কিংবা সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে—যা বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে এগুলো শক্তিশালী স্থবির-মূল্যস্ফীতিমূলক চাপ তৈরি করছে। ২০২৫ সালের প্রযুক্তি ও শুল্কের ঢেউ একে অপরকে সামঞ্জস্য করে স্থিতিশীলতা এনেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ঢেউয়ের সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও তীব্র ও জটিল করছে। এর ফল স্থিতিশীলতা নয়, বরং অনিশ্চয়তা—অর্থনৈতিক, আর্থিক, আর্থিক নীতি ও রাজনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই। এ কারণেই এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।
অ্যান্ডি হ্যালডেন 



















