তিন সপ্তাহ ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ ইরান যুদ্ধ ক্রমেই একটি পরিচিত ও বিপজ্জনক ধাঁচের দিকে এগোচ্ছে। এই সংঘাত আপাতত আফগানিস্তান, ইরাক বা ভিয়েতনামের যুদ্ধের মতো নয়—এখনও বিপুলসংখ্যক মার্কিন স্থলবাহিনী এতে জড়ায়নি। কিন্তু গভীর কৌশলগত বাস্তবতায় এটি সেই পুরনো যুদ্ধগুলোরই প্রতিধ্বনি। যুক্তরাষ্ট্র আবারও একটি তুলনামূলক দুর্বল আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে, অথচ তাদের সামনে নেই পরিষ্কার লক্ষ্য, নির্দিষ্ট বিজয় কৌশল কিংবা কার্যকর প্রস্থান পরিকল্পনা।
এর ফল হচ্ছে এক নতুন ধরনের জটিলতা—তবুও সেটি এক ধরনের অচলাবস্থা। মার্কিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে আকাশ ও সমুদ্রপথে আটকে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতায় এবং ইরান, ইসরায়েল, লেবাননসহ বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। এই যুদ্ধে ভারসাম্যহীনতা দুর্বল পক্ষের পক্ষে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জয় মানে হতে পারে শাসন পরিবর্তন বা এমন একটি দুর্বল ইরান, যা আর অঞ্চল অস্থিতিশীল করতে বা বৈশ্বিক তেলের বাজারে বিঘ্ন ঘটাতে পারবে না। অন্যদিকে ইরানের জন্য জয় মানে টিকে থাকা এবং মাঝে মাঝে হামলার মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করা—যেমন হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা বা উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানা।
ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্তমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইরানের ক্ষমতাসীন ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারবে না। একইভাবে, এটি ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাকেও পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে যুদ্ধ আরও বাড়ানোর প্রলোভন তৈরি হচ্ছে—স্থলবাহিনী পাঠানো বা বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সমর্থন দেওয়া। কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপের ঝুঁকি সম্ভাব্য লাভের তুলনায় অনেক বেশি। এই মুহূর্তে, বৈশ্বিক অর্থনীতি অস্থির এবং মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত অবস্থায় থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হলো এই যুদ্ধে আরও জড়িয়ে না পড়ে বেরিয়ে আসার উপায় খোঁজা।
বিজয়ের কোনো স্পষ্ট পথ নেই
শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশলে অসংগতি ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ না করেই সামরিক অভিযান শুরু করেন। তার প্রাথমিক বক্তব্যে তিনি ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান, যা কার্যত শাসন পরিবর্তনকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে। এটি ছিল অত্যন্ত উচ্চ এবং প্রায় অসম্ভব একটি লক্ষ্য। একই সঙ্গে এটি ইরানের জন্য সহজ পথ তৈরি করে দেয়—শুধু টিকে থাকলেই জয়।
প্রাথমিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপ বরং ইরানে কঠোরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। শীর্ষ নেতাদের হত্যাও ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করেনি। নিরাপত্তা বাহিনীর ভাঙনের কোনো লক্ষণ নেই। বরং ইরান তাদের যুদ্ধ পরিচালনায় সুসংগঠিত কাঠামো বজায় রেখেছে। নেতৃত্বের ওপর হামলা হলেও বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা বরং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আগে ধারণা ছিল, তার মৃত্যুর পর ইরানের নেতৃত্বে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের চাপের মধ্যে নেতৃত্ব পরিবর্তন হওয়ায় সবচেয়ে কঠোরপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। খামেনির ছেলে মোজতবা এখন সর্বোচ্চ নেতা, যিনি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ঘনিষ্ঠ এবং কঠোর অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটি কোনো সংস্কারের ইঙ্গিত নয়, বরং ক্ষমতার আরও দৃঢ় প্রতিষ্ঠা।
অসম যুদ্ধের বাস্তবতা
যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযান ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করতে পারলেও পুরোপুরি থামাতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অবকাঠামো রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কিন্তু ইরানের জন্য শুধু মাঝে মাঝে সফল হামলাই যথেষ্ট—যেমন একটি ট্যাঙ্কারে আঘাত বা তেল স্থাপনায় হামলা। এমনকি ৯০ শতাংশ হামলা প্রতিহত হলেও বাকি ১০ শতাংশ বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই যুদ্ধ ইরানের জন্য নির্ণায়কভাবে জেতার প্রয়োজন নেই। শুধু দেখাতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত লক্ষ্যও ব্যর্থ হচ্ছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে ইরান ধারাবাহিকভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হয়ে গেলেও স্বল্পপাল্লার অস্ত্র, ড্রোন ও মাইন ব্যবহার করে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করতে পারবে।

সংঘাত বাড়ানোর ফাঁদ
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আরও বাড়ানোর কথা ভাবতে পারে—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা করা। কিন্তু অতীতের মতোই এসব পদক্ষেপ ঝুঁকিপূর্ণ। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করার চেষ্টা করা হলেও এটি সহজ হবে না, কারণ তা সুরক্ষিত স্থানে সংরক্ষিত এবং অভিযানে স্থলবাহিনী প্রয়োজন হবে।
আরেকটি বিকল্প হতে পারে খার্গ দ্বীপ দখল করা, যেখান দিয়ে ইরানের বেশিরভাগ তেল রপ্তানি হয়। কিন্তু এটি একটি বড় সামরিক অভিযান হবে এবং এতে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তাছাড়া এতে বৈশ্বিক তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
এছাড়া ইরানের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করলে তা গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এতে তুরস্ক, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশও জড়িয়ে পড়তে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
সীমিত প্রস্থানের প্রয়োজনীয়তা
তিন সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ—যুদ্ধ বাড়ানো বা কৌশল পরিবর্তন করে বেরিয়ে আসা। সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হলো দ্বিতীয়টি। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করতে পারে যে তারা সীমিত লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে।
ইরান শুরুতে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। চীন, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোও এই সংঘাত শেষ করতে আগ্রহী হবে।
এটি কোনো সুস্পষ্ট বিজয় হবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল কিন্তু আরও আক্রমণাত্মক একটি ইরানের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় বাড়বে এবং অন্যান্য অঞ্চলে প্রভাব পড়বে। তবুও এটি দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় এড়ানোর একটি পথ।
শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা হলো—এই যুদ্ধে বিজয় নয়, ক্ষতি সীমিত করাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। অতীতের মতো আবারও একই ভুল করা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া—যখন খরচ লাভের চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন পিছু হটা-ই সবচেয়ে দায়িত্বশীল পথ।
ইলান গোল্ডেনবার্গ 



















