অপারেশন এপিক ফিউরি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইরান এবং তার সহযোগীদের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়—যার যথেষ্ট কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের কুদস ফোর্স ইরানি টেলিভিশনে সতর্কবার্তা প্রচার করে জানায়, “শত্রুদের জানা উচিত তাদের সুখের দিন শেষ, তারা পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ থাকবে না, এমনকি নিজেদের ঘরেও নয়।”
এই হুমকির পর ইরানের নির্দেশে পরিচালিত বিভিন্ন তৎপরতার সঙ্গে আজারবাইজান, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যে ষড়যন্ত্রের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরান হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সুপ্ত কোষ সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “আমরা অনেক ভয়ংকর ঘটনার খবর জানি এবং আমরা পরিস্থিতির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছি।”
ইরান দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবাদকে পররাষ্ট্রনীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মতাদর্শের গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়া এবং শত্রুদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি—উভয় উদ্দেশ্যেই এই কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে। তবে তেহরান সাধারণত কৌশলগতভাবে সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার করেছে—কখন, কোথায় এবং কীভাবে হামলা চালানো হবে তা নিয়ে তারা সতর্ক ছিল। তারা এমন অপারেশন পছন্দ করত, যেখানে সরাসরি দায় অস্বীকার করা সম্ভব হয়, যাতে নিষেধাজ্ঞা বা প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি কমে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কারণে নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছে ইরান। খামেনেইসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং শাসন পরিবর্তনের আলোচনা তেহরানকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে যুদ্ধ থামাতে তারা যেকোনো পথ বেছে নিতে পারে—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই হামলা চালানো পর্যন্ত।
নেতৃত্বে বড় ধরনের ক্ষতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় ইরান এখন নানা ধরনের হামলার অনুমোদন দিতে পারে—ছোট ষড়যন্ত্র থেকে শুরু করে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা পর্যন্ত। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও রাজনীতিবিদরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করতে পারবে না। ফলে বড় ধরনের হামলা সফল হলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।
যুদ্ধ চলতে থাকলে ইরান আরও মরিয়া হয়ে সন্ত্রাসী কৌশল গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে নরম লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বাড়তে পারে, পাশাপাশি শক্ত লক্ষ্যবস্তুতে জটিল হামলার প্রস্তুতিও চলতে পারে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি হামলায় ইরানের সাফল্য কম থাকলেও ব্যর্থ পরিকল্পনাগুলো নিরাপত্তার ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করা উচিত নয়। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থাগুলোর প্রতিবার সফল হতে হয়, কিন্তু হামলাকারীদের জন্য একবার সফল হওয়াই যথেষ্ট।
সহিংসতার ইতিহাস
কুদস ফোর্সের সাম্প্রতিক বার্তা ইঙ্গিত দেয় যে এখন তেহরানে সন্ত্রাসবাদের ব্যবহার নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তবে অতীতে এই বিষয়ে মতবিরোধ ছিল। আশির দশকে বিপ্লবী নেতৃত্বের একাংশ সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রনীতির বৈধ হাতিয়ার হিসেবে দেখত, অন্য অংশ সীমিতভাবে এটি ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
ক্রমে কঠোরপন্থীরা প্রাধান্য পায় এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর সন্ত্রাসবাদ তেহরানের অন্যতম প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। তবে দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি হামলা এড়িয়ে চলা হয় প্রতিশোধের ভয়ে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে ২০১১ সালে, যখন ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে গোপন সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।
সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কূটনীতিকদের লক্ষ্য করে একাধিক ষড়যন্ত্র হয়। ২০১১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এরপর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর বিষয়ে আরও আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
২০২০ সালে কুদস ফোর্স প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক ইরান-সমর্থিত হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া হয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে একটি “অভ্যন্তরীণ অপশন” তৈরি করার চেষ্টা করেছে, যেখানে অপরাধী চক্র ও সহযোগীদের ব্যবহার করে হামলা চালানো যায়।
সম্প্রতি এক পাকিস্তানি নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে হত্যার ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ইরান অপরাধী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে হামলার পরিকল্পনা করে, যাতে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ কম থাকে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পাল্টা আঘাত
২০২৫ সালের হুমকি মূল্যায়নে বলা হয়, ইরান বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা এবং নেতৃত্বের ওপর হামলা চালায়।
এই পরিস্থিতিতে ইরান হুমকি দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা সুপ্ত কোষ সক্রিয় করবে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তা ঘটেনি, তবে ইউরোপে একাধিক ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়।
বর্তমানে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান তাদের কৌশল বদলে ফেলেছে। এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার মতে, তেহরান এখন সব ধরনের সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়েছে এবং যেখানেই সম্ভব, সেখানে হামলার নির্দেশ দিচ্ছে। তারা সংগঠিত অপরাধী, ভাড়াটে যোদ্ধা এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, খামেনেইর মৃত্যুর পর এনক্রিপ্টেড বার্তার মাধ্যমে সুপ্ত নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হতে পারে। একই সঙ্গে একক হামলাকারীদের ঝুঁকিও বেড়েছে।
ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইসরায়েলি কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে দুটি হামলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কাতারে সন্দেহভাজন গুপ্তচর নেটওয়ার্ক ধরা পড়েছে। যুক্তরাজ্যে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর নজরদারির অভিযোগে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আজারবাইজানে তেল পাইপলাইন ও উপাসনালয় লক্ষ্য করে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা হয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সক্ষমতা কিছুটা কমেছে, তবুও তারা অবশিষ্ট শক্তি একত্রিত করে যৌথ হামলার চেষ্টা করতে পারে।
প্রতিশোধের মাধ্যমে প্রতিরোধ
এখন পর্যন্ত ইরানের কোনো বড় পরিকল্পনা সফল না হলেও এটি যেমন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাফল্য, তেমনি ইরানের সীমাবদ্ধতারও প্রমাণ। তবে যুদ্ধ চলতে থাকলে এবং এমনকি শেষ হলেও সন্ত্রাসী হুমকি থেকে যাবে।
ইরানের নেতৃত্ব যত বেশি নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে, ততই তারা সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার করার সম্ভাবনা বাড়বে। নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইআরজিসির প্রভাব বাড়তে পারে এবং তারা প্রতিশোধ নিতে আরও আগ্রাসী হতে পারে।
তেহরান মনে করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের হামলা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং যুদ্ধ বন্ধে চাপ বাড়াবে। তবে এর উল্টো ফলও হতে পারে—যেখানে জনগণ যুদ্ধের পক্ষে একত্রিত হয়ে যাবে।
বর্তমানে ইরানের কাছে বিকল্প কম। তাই তারা যেখানেই পারে, যতটা পারে, আঘাত হানার চেষ্টা করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এই মরিয়া অবস্থাকে গুরুত্ব সহকারে দেখা, কারণ এই হতাশা থেকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ম্যাথিউ লেভিট 



















