০৪:৩০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬
আসামে জঙ্গি হামলা: গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণে আহত ৪, পালিয়ে গেল হামলাকারীরা শিশুদের ক্ষতির দায়ে প্রযুক্তি জায়ান্টদের বিরুদ্ধে রায়, সামাজিক মাধ্যম নিয়ে নতুন দিগন্তের সূচনা মঙ্গালুরু বন্দরে জ্বালানির জোয়ার, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল-গ্যাস আনলো জাহাজ ডিজেলের সিন্ডিকেটে জিম্মি ঝিনাইদহ, চাষাবাদে বাড়ছে খরচে কৃষকের দিশেহারা অবস্থা চাল-গম সংগ্রহে বড় ঘাটতি, সংসদীয় কমিটির সতর্কবার্তা—পরিকল্পনা জোরদারের তাগিদ রানের জাদুতে নতুন নায়ক স্মরণ, রঞ্জি ট্রফিতে ঝড় তুলে আইপিএল স্বপ্নে চোখ তেলবাজারে ধাক্কা, যুদ্ধ থামাতে প্রস্তাব—ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে আলাবামার ইসলামিক একাডেমি থেকে কংগ্রেস, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইসলামভীতির নতুন ঢেউ দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ঝড়ের ইঙ্গিত, জ্বালানি সংকটে টালমাটাল ঈদের ভিড়ে রংপুরে টিকিট সংকট, কাউন্টারে নেই—কালোবাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি

ইরানের ‘ভিয়েতনাম মুহূর্ত’

২০১৮ সালে পিয়ংইয়াং সফরের সময় এক শীর্ষ উত্তর কোরীয় কর্মকর্তা আমাদের প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন, “আমরা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে আমরা এখন পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সমতা অর্জন করেছি।” এটি আসলে তাদের সর্বশেষ পারমাণবিক পরীক্ষার ইঙ্গিত ছিল এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে হাইড্রোজেন বোমা স্থাপনের সক্ষমতার দাবি বোঝাত।

এই বক্তব্যের জবাবে আমাদের সঙ্গে থাকা এক ভিয়েতনামি সহকর্মী শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমরা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব বুঝি, কিন্তু জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

এই সংলাপটি আজ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে তীব্র প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি শান্ত হলে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি আত্মরক্ষার জন্য উত্তর কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ও কড়া রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি যুদ্ধ-পরবর্তী ভিয়েতনামের মতো কূটনীতিকে জোরদার করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পুনরায় যুক্ত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্যথায়, এই যুদ্ধ একটি বিপজ্জনক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হতে পারে, যেখানে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত নিয়মিত ঘটবে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ নিয়ে যা ...

বর্তমান সংঘাতটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘ এক দশকের উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ। ট্রাম্প তার পূর্বসূরি বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে আসেন, যা দুই পক্ষকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উৎসাহে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালান এবং পরবর্তীতে যৌথ আকাশ হামলার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা করেন।

যুদ্ধের শুরুতে বড় ধরনের আঘাত পেলেও ইরান দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশলের মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক কমান্ডারদের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা দেয়। ফলে তারা বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলা চালায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলিত আক্রমণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে। অন্তত ১৭টি মার্কিন স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও রয়েছে।

ইরান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে। বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা যুদ্ধের প্রভাবকে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়। যদিও তেহরান কিছু হামলার দায় অস্বীকার করেছে এবং প্রতিবেশীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে, তারা অভিযোগ করেছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন সামরিক কার্যক্রমকে সহায়তা করছে এবং শান্তির শর্ত হিসেবে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

ইরানের জটিল রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত যে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

Iran's top security chief Ali Larijani killed in airstrike, state media says

উত্তেজনা বাড়িয়ে তেহরান ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী চুক্তিতে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ ব্যয়ের চাপের কারণে তারা শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং নিজেদের শর্তে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পুনরায় যুক্ত হতে আগ্রহী। এমনকি সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতিও দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশটির নিহত নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি উন্নয়নের পথে এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন, যাতে জনগণের জন্য সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী তখনই পুনরায় খুলবে, যখন এটি সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হয়ে উঠবে।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানের পতন বা পারমাণবিক অস্ত্রধারী আগ্রাসী প্রতিবেশী—কোনোটিই চায় না। উভয় পরিস্থিতিই তাদের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই ওমানসহ অন্যান্য দেশ কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।

এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সেখানে একসময় আক্রমণাত্মক ভিয়েতনামকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীতে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। সংঘাত প্রতিরোধ, পারস্পরিক আক্রমণ এড়ানো এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের এই সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের আরও শক্তিশালী করবে।

Russia Rakes in Oil Cash Amid War: Evening Briefing Americas - Bloomberg

বর্তমানে রাশিয়া তেলের দাম বাড়ার সুবিধা নিচ্ছে, আর চীন ইরানের সামরিক কৌশল বিশ্লেষণ করছে। একই সঙ্গে তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন। অতীতে যেমন হেনরি কিসিঞ্জার শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তেমনি এখন নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, একমাত্র কার্যকর পথ হলো একটি বিস্তৃত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পুনঃস্থাপন করা যাবে। অন্যথায় তেহরানও উত্তর কোরিয়ার মতো একটি ‘পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার পথে এগোবে।

লেখক: রিচার্ড হেইদারিয়ান একজন এশিয়া-ভিত্তিক ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং “দ্য ইন্দো-প্যাসিফিক: ট্রাম্প, চীন অ্যান্ড দ্য নিউ স্ট্রাগল ফর গ্লোবাল মাস্টারি” বইয়ের লেখক। 

জনপ্রিয় সংবাদ

আসামে জঙ্গি হামলা: গ্রেনেড বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণে আহত ৪, পালিয়ে গেল হামলাকারীরা

ইরানের ‘ভিয়েতনাম মুহূর্ত’

১১:০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

২০১৮ সালে পিয়ংইয়াং সফরের সময় এক শীর্ষ উত্তর কোরীয় কর্মকর্তা আমাদের প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন, “আমরা এখন একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছি।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে আমরা এখন পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সমতা অর্জন করেছি।” এটি আসলে তাদের সর্বশেষ পারমাণবিক পরীক্ষার ইঙ্গিত ছিল এবং আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে হাইড্রোজেন বোমা স্থাপনের সক্ষমতার দাবি বোঝাত।

এই বক্তব্যের জবাবে আমাদের সঙ্গে থাকা এক ভিয়েতনামি সহকর্মী শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমরা বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব বুঝি, কিন্তু জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

এই সংলাপটি আজ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে তীব্র প্রভাব ফেলছে। পরিস্থিতি শান্ত হলে তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি আত্মরক্ষার জন্য উত্তর কোরিয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ও কড়া রাষ্ট্রে পরিণত হবে, নাকি যুদ্ধ-পরবর্তী ভিয়েতনামের মতো কূটনীতিকে জোরদার করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় পুনরায় যুক্ত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্যথায়, এই যুদ্ধ একটি বিপজ্জনক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হতে পারে, যেখানে অনিশ্চয়তা ও সংঘাত নিয়মিত ঘটবে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ নিয়ে যা ...

বর্তমান সংঘাতটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘ এক দশকের উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ। ট্রাম্প তার পূর্বসূরি বারাক ওবামার করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে আসেন, যা দুই পক্ষকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উৎসাহে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালান এবং পরবর্তীতে যৌথ আকাশ হামলার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা করেন।

যুদ্ধের শুরুতে বড় ধরনের আঘাত পেলেও ইরান দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কৌশলের মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক কমান্ডারদের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা দেয়। ফলে তারা বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা ও ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত হামলা চালায়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলিত আক্রমণে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে। অন্তত ১৭টি মার্কিন স্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে উন্নত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থাও রয়েছে।

ইরান পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে। বাণিজ্যিক নির্ভরশীলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা যুদ্ধের প্রভাবকে বৈশ্বিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়। যদিও তেহরান কিছু হামলার দায় অস্বীকার করেছে এবং প্রতিবেশীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে, তারা অভিযোগ করেছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন সামরিক কার্যক্রমকে সহায়তা করছে এবং শান্তির শর্ত হিসেবে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

ইরানের জটিল রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রকৃত প্রক্রিয়া স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু নিশ্চিত যে দেশটি বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

Iran's top security chief Ali Larijani killed in airstrike, state media says

উত্তেজনা বাড়িয়ে তেহরান ভবিষ্যৎ হামলা ঠেকাতে এবং যুদ্ধ-পরবর্তী চুক্তিতে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ ব্যয়ের চাপের কারণে তারা শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং নিজেদের শর্তে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় পুনরায় যুক্ত হতে আগ্রহী। এমনকি সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরান গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতিও দেখিয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশটির নিহত নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি উন্নয়নের পথে এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন, যাতে জনগণের জন্য সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী তখনই পুনরায় খুলবে, যখন এটি সবার জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ হয়ে উঠবে।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানের পতন বা পারমাণবিক অস্ত্রধারী আগ্রাসী প্রতিবেশী—কোনোটিই চায় না। উভয় পরিস্থিতিই তাদের জন্য বড় ঝুঁকি। তাই ওমানসহ অন্যান্য দেশ কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে।

এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সেখানে একসময় আক্রমণাত্মক ভিয়েতনামকে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীতে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। সংঘাত প্রতিরোধ, পারস্পরিক আক্রমণ এড়ানো এবং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।

পারস্য উপসাগরের এই সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের আরও শক্তিশালী করবে।

Russia Rakes in Oil Cash Amid War: Evening Briefing Americas - Bloomberg

বর্তমানে রাশিয়া তেলের দাম বাড়ার সুবিধা নিচ্ছে, আর চীন ইরানের সামরিক কৌশল বিশ্লেষণ করছে। একই সঙ্গে তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদনে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন। অতীতে যেমন হেনরি কিসিঞ্জার শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তেমনি এখন নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, একমাত্র কার্যকর পথ হলো একটি বিস্তৃত কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পুনঃস্থাপন করা যাবে। অন্যথায় তেহরানও উত্তর কোরিয়ার মতো একটি ‘পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার পথে এগোবে।

লেখক: রিচার্ড হেইদারিয়ান একজন এশিয়া-ভিত্তিক ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং “দ্য ইন্দো-প্যাসিফিক: ট্রাম্প, চীন অ্যান্ড দ্য নিউ স্ট্রাগল ফর গ্লোবাল মাস্টারি” বইয়ের লেখক।