লেবাননের রাজধানী বৈরুতের সমুদ্রতীরবর্তী কর্নিশ—যেখানে একসময় ছিল স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন, দৌড়ানো মানুষ আর বিলাসিতার ছোঁয়া—সেই একই জায়গা এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। একদিকে ঝকঝকে অ্যাপার্টমেন্ট, দামী রেস্তোরাঁ আর আরামদায়ক জীবন, অন্যদিকে খোলা আকাশের নিচে তাবু গেঁড়ে বেঁচে থাকার লড়াই—এই দ্বৈত বাস্তবতা এখন শহরের নতুন পরিচয়।
যুদ্ধের ছোবলে ভেঙে পড়া জীবন
ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর থেকেই লেবাননে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে। দেশজুড়ে এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। দক্ষিণ লেবানন, বৈরুতের উপকণ্ঠ এবং বেকা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় হামলার ফলে হাজারো পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সমুদ্রতীরেই এসে ভিড় করছে।

এই বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে রয়েছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ—যাদের অনেকেরই খাবার, পানি কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ঠান্ডা রাত কাটাতে তারা ছোট ছোট আগুন জ্বালাচ্ছে, কিন্তু তীব্র বাতাস আর বৃষ্টির কাছে তা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ছে। রমজান মাসে রোজা রেখে তাদের এই দুর্দশা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিলাসিতার মাঝেই বেদনার শহর
একই কর্নিশে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ পরিবার নিয়ে হাঁটছে—যেন পাশেই চলা মানবিক সংকট তাদের স্পর্শই করছে না। সমুদ্রের দিকে তাকালে ঝলমলে দৃশ্য, কিন্তু একটু পাশ ফিরলেই দেখা যায় তাবু, ক্ষুধার্ত শিশু আর অনিশ্চয়তায় ভরা জীবন।
এই বৈপরীত্যই বৈরুতের বর্তমান বাস্তবতা—একই স্থানে দুই পৃথিবীর সহাবস্থান।
হামলার ভয়, তবুও ফিরে আসা
কর্নিশ এলাকাও এখন নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক হামলায় সেখানকার গাড়িতে আঘাত লেগে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবুও বাস্তুচ্যুত মানুষদের অনেকেই আবার এই সমুদ্রতীরে ফিরে আসছে। কারণ, তাদের কাছে এটি অন্তত কিছুটা শান্তির অনুভূতি দেয়, যদিও সেই শান্তি মুহূর্তেই ভেঙে পড়তে পারে।
অনেক পরিবারের মতোই এক ব্যক্তি তার সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাবুতে। হামলার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে তারা অন্যত্র চলে গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে আসে সমুদ্রতীরে—কারণ অন্য কোথাও তাদের স্থায়ী আশ্রয় নেই।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বৈরুতের এই সমুদ্রতীর যুদ্ধের নতুন সাক্ষী নয়। অতীতেও বহু সংঘাতের সময় এই অঞ্চল ধ্বংস হয়েছে, আবার পুনর্গঠিত হয়েছে। ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধ, ২০২০ সালের বিস্ফোরণ এবং সাম্প্রতিক সংঘাত—সবকিছুই এই শহরের স্মৃতিতে গভীর দাগ রেখে গেছে।
![]()
তবুও প্রতিবারের মতো এবারও মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছে।
ক্লান্তি আর মানসিক অবসাদ
যুদ্ধের ধারাবাহিকতা মানুষের মানসিক অবস্থাকেও বদলে দিয়েছে। অনেকেই এখন আর আগের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায় না, যেন তারা এই বাস্তবতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। একধরনের মানসিক ক্লান্তি আর উদাসীনতা তাদের মধ্যে কাজ করছে।
তবুও কেউ কেউ সমুদ্রের ধারে বসে, ধর্মীয় পাঠে মন দিয়ে বা স্বাভাবিক জীবনযাপনের ছোট ছোট চেষ্টার মাধ্যমে নিজেদের স্থির রাখার চেষ্টা করছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















