ইরানকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অংশগ্রহণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বহু দশকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এই প্রথম দুই দেশের সেনাবাহিনী এতটা সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করল। পরিকল্পনা থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তথ্য, আক্রমণ পরিচালনা এবং ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই ছিল নজিরবিহীন সমন্বয়।
একই পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল
ইসরায়েল বহু বছর ধরেই একটি নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করে আসছে, যেখানে শত্রুপক্ষ শক্তি পুনর্গঠন করলেই আবার হামলা চালানো হয়। এই ধারাকে তারা নিজেরাই বলে “ঘাস কাটা” কৌশল। অর্থাৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, বরং বারবার আঘাত করে শত্রুকে দুর্বল রাখা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বিশ্বাসী। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে তারা সাধারণত নতুন ইস্যুতে মনোযোগ দেয়। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে সেই অবস্থান বদলাতে দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান অভিযান শেষ হলেও ভবিষ্যতে আবারও একই ধরনের হামলায় ফিরতে হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রকে এক ধরনের অন্তহীন সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ফলে সামরিক কিংবা কূটনৈতিক কোনো পথই সহজ সমাধান দিচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা আরও বেড়েছে। বিশেষ করে আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় যৌথ কাজ এই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও চাপ
তবে এই জোটের মূল্যও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়ার অনেক দেশই এই যুদ্ধকে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা নতুন করে শরণার্থী সংকট ও প্রক্সি যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আগে যেভাবে ওয়াশিংটনকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য শক্তি হিসেবে দেখা হতো, এখন তা বদলে যেতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ইসরায়েল-নির্ভর নীতির সমালোচনা বাড়ছে। বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক শিবিরেই এই প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের প্রভাব কি অতিরিক্ত হয়ে গেছে। এতে ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ইরানের নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা নিজেদের ক্ষতির প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা আঘাত হানার পথেই এগোতে পারে। ফলে এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্র যে দূরত্ব বজায় রেখে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছিল, তা এখন হারানোর ঝুঁকিতে। একসময় যে সম্পর্ক ছিল দুই পক্ষের জন্য লাভজনক, তা এখন ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকেই যাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















