মাঠজুড়ে সবুজ ধানের ঢেউ, কোথাও সোনালি রঙের আভাস—এই সময়টাই কৃষকের সবচেয়ে আশার, আবার সবচেয়ে ভয়েরও। ফসল ঘরে তুলতে পারলেই স্বস্তি, কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের মাঝেই নেমে এসেছে দুশ্চিন্তার ছায়া। আগাম বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি আর বন্যার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক এখন উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন।
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার আতঙ্ক
সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে সবচেয়ে বড় ভয় এখন পাহাড়ি ঢল। মার্চেই অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় কৃষকের মনে শঙ্কা আরও বেড়েছে। সামনে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় আতঙ্ক বাড়ছে দিন দিন। দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদিত হয় এই হাওরাঞ্চলে, কিন্তু এখনও অনেক জমির ধান পুরোপুরি পাকে নি।
নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। প্রতিবছরের মতো এবারও পার্বত্য অঞ্চল থেকে নামা ঢল বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

বাঁধ নির্মাণে দেরি, বাড়ছে শঙ্কা
ফসল রক্ষার প্রধান ভরসা বাঁধ নির্মাণের কাজ এবারও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। অনেক এলাকায় কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাওয়ার পরও বাঁধের কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরের মতো এবারও দেরি ও অব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এতে আগাম বন্যা এলে বিপুল ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা কৃষকের মনে এই শঙ্কাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
শিলাবৃষ্টিতে মাঠজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি
হাওরের বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও শিলাবৃষ্টি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুট্টা, মরিচ, বেগুনসহ নানা ফসল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। আম ও লিচুর মুকুল ঝরে গেছে, ফলে ফলন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
কিছু এলাকায় বড় আকারের শিলার আঘাতে জমি সাদা হয়ে গেছে। একদিনেই হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, এবারের শিলার আকার আগের তুলনায় বড় হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণও বেশি। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন, এখন সেই ঋণ শোধ করা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

জলাবদ্ধতায় নতুন সংকট
কিছু হাওর এলাকায় শিলাবৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলাবদ্ধতা। পানি নিষ্কাশনের দুর্বল ব্যবস্থার কারণে জমিতে পানি জমে ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য উৎপাদন এখন ঝুঁকির মুখে।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা মিলছে না। পানি নামানোর ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়, ফলে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
সরকারি উদ্যোগ ও সতর্কতা
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্চের মাঝামাঝি থেকে দীর্ঘ সময়জুড়ে ঝড়, অতিবৃষ্টি ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি থাকে। এই সময়টিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এখন থেকেই বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















