যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে অপ্ররোচিত ও নির্মম যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য দিক হতে পারে—এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিশেষ করে বিশ্বের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ভূমিকা এতে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারকারী মার্কিন সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হতে পারে এবং মানবজাতি একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে।
ইতিহাস কি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে? ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট এবং ২০২৬ সালের হরমুজ প্রণালী—এই দুই ঘটনার মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও সুয়েজ সংকটের তুলনা
১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সামরিক হামলা চালায়। তারা দ্রুত সামরিকভাবে এগিয়ে গেলেও নাসের খাল বন্ধ করে দেন, ফলে ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সামরিক জয়ের বদলে ব্রিটেনকে অপমানজনকভাবে পিছু হটতে হয়। অর্থনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও আর্থিক সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়।
এই ঘটনাকে সামনে রেখে বিশিষ্ট গবেষক আলফ্রেড ম্যাককয় তার প্রবন্ধে যুক্তি দেন যে, ইরান যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই ধরনের মোড় পরিবর্তনের ঘটনা হতে পারে।
মার্কিন শক্তির আড়ালে কৌশলগত দুর্বলতা
ম্যাককয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী পদক্ষেপ ‘মাইক্রো-মিলিটারিজম’-এর উদাহরণ—যেখানে পতনশীল সাম্রাজ্য সীমিত সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এসব হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নয়, বরং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।
অতীত হস্তক্ষেপের ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা
১৯৫৩ সালে ইরানে গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সিআইএ শাহকে ক্ষমতায় বসায়, যা পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের জন্ম দেয়। গুয়াতেমালা, কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
আফগানিস্তানে ২০০১ সালের আগ্রাসন দুই দশক পর ব্যর্থতায় শেষ হয় এবং তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণও দীর্ঘ সংঘাত ও দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামোর জন্ম দেয়। লিবিয়ায় ২০১১ সালের হস্তক্ষেপ দেশটিকে ভেঙে দেয়। এমনকি কিউবা ও ভেনেজুয়েলায় ব্যর্থ হস্তক্ষেপও লক্ষ্যবস্তু সরকারকে আরও শক্তিশালী করেছে।
হরমুজ প্রণালী ও কৌশলগত ব্যাঘাত
বর্তমান সংঘাতে ইরান দেখিয়েছে, কীভাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনীতে আঘাত করেছে।
এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। এখানে ব্যাঘাত ঘটলে তা সরাসরি জ্বালানির দাম বাড়ায়, সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত করে এবং কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব ফেলে।

অসম সামরিক বাস্তবতা
ম্যাককয় দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল, যেমন ইন্টারসেপ্টর মিসাইল। অন্যদিকে, ইরান তুলনামূলক সস্তা ড্রোন বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই অসমতা ইরানের পক্ষেই সুবিধা এনে দেয়।
স্থলযুদ্ধের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থলযুদ্ধে যেতে অনিচ্ছুক, কারণ এতে ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে। এর বদলে তারা অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যেমন কুর্দিদের বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার কারণে কুর্দিরা এখন সতর্ক এবং এই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন
ম্যাককয় মনে করেন, ইরান যুদ্ধ বৃহত্তর এক প্রবণতার অংশ—যেখানে ইউরেশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাচ্ছে। ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াচ্ছে, রাশিয়া পশ্চিমা প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করছে, তুরস্ক স্বাধীন নীতি নিচ্ছে, আর ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব স্পষ্ট। অতীতের মতো বড় জোট গঠন করতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত
এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আর একক বৈশ্বিক শক্তি নয়। বরং একটি নতুন বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে। ইরান যুদ্ধ এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
যেমন ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করেছিল, তেমনি ইরান যুদ্ধ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের পতনের প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদি সামরিক সাফল্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বিপর্যয়, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রতিপক্ষের শক্তি বৃদ্ধি—এসবই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাস হুবহু পুনরাবৃত্তি না হলেও, তার ধারা ও শিক্ষা বর্তমানকে বোঝার পথ দেখায়। সামরিক শক্তি দিয়ে একক আধিপত্য বজায় রাখা সম্ভব নয়—বরং তা কখনও কখনও পতনকে ত্বরান্বিত করে।
রিগোবের্তো ডি. তিগলাও 



















