পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ১৫ মার্চ থেকে নির্বাচন কমিশন ৪৮৩ প্রশাসনিক ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলির নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে আসাম, কেরালা ও তামিলনাড়ুতে ভোট চলাকালীন তিনটি রাজ্যে বদলি হওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ২৩। পুদুচেরি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এ ধরনের কোনো বদলির নির্দেশ নেই।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশন মাত্র ১৫ জন কর্মকর্তাকে বদলি করেছিল। এবার এত বড় আকারের বদলি নিয়ে বিরোধ, সংসদে পদত্যাগ এবং রাজ্য সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনী প্রচারণা সভায় বলেছেন, “তারা কর্মকর্তাদের বদলি করেছে। যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদেরকে মনোনয়ন বাতিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে আপনার কাগজপত্র যাচাই করুন।”

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এ বদলির সিদ্ধান্ত রাজ্যের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা দফতর এবং কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট ও স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে। একজন সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা বলেছেন, “আমাদের এমন কর্মকর্তাদের থাকার অনুমতি নেই, যাদের আচরণ নিয়ে সন্দেহ আছে।”
পশ্চিমবঙ্গ ভারতীয় জনতা পার্টির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেছেন, “বদলি আদেশ নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার মধ্যে। নির্বাচন কমিশন যে কোনোভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। আসন্ন নির্বাচনে আমরা একটাই চাই — নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং পরিষ্কার ভোটার তালিকা।”
বদলির ধারা
নির্বাচন কমিশনের পশ্চিমবঙ্গের বদলির আদেশগুলো ধাপে ধাপে এসেছে। ১৫ মার্চ প্রথমে ৭৯ জন কর্মকর্তার বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়, যার মধ্যে ছিলেন প্রধান সচিব, গৃহ সচিব, পুলিশ মহাপরিচালক এবং কলকাতা পুলিশ কমিশনার। এরপর ১৭ ও ১৮ মার্চ ৩৮ জন আইপিএস ও ১৩ জন আইএএস কর্মকর্তার বদলি হয়। ২৩ মার্চ ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে সরানো হয়। ২৯ মার্চ ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের বদলি করা হয় এবং জেলা পর্যায়ে ১৮৪ জন ইন্সপেক্টর-র্যাঙ্কিং পুলিশ কর্মকর্তাকে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। এছাড়াও ১৩ জন সিনিয়র আইপিএস কর্মকর্তাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে পর্যবেক্ষক হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ২০২১ সালের নির্বাচনের পরের প্রমাণিত নির্বাচনী সহিংসতা উল্লেখ করে এই ব্যাপক বদলিকে যুক্তিসঙ্গত করেছে। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, “২০২১ সালের ফলাফল ঘোষণার পর লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড এবং স্থানচ্যুতি ঘটেছিল। এবার তা যেন না ঘটে, এজন্যই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের গোয়েন্দা এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এটি পশ্চিমবঙ্গ দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত পদক্ষেপ।” তৃণমূল কংগ্রেস ১৬ মার্চ রাজ্যসভায় এই বদলির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, “কর্মকর্তাদের বদলি রাজ্যভেদে পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। আমাদের ক্ষমতা আছে যে নির্বাচনের প্রক্রিয়া সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং সহিংসতা মুক্ত রাখতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া। এবং আমরা সেটাই করছি।” নির্বাচন কমিশন কলকাতা হাই কোর্টে এও জানিয়েছে যে, বদলি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। অভিযোগপত্রের শুনানিতে হাই কোর্ট ৩১ মার্চ আবেদন বাতিল করেছে।
সিনিয়র কর্মকর্তা আরও বলেন, “কর্মকর্তাদের বদলি রাজ্যভেদে পরিস্থিতি অনুযায়ী হয়। আমরা নিশ্চিত করি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সুষ্ঠু, ন্যায্য ও সহিংসতা মুক্ত থাকবে—এটাই আমরা করছি।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















