এশিয়াজুড়ে ডিম উৎপাদন গত তিন দশকে নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, সস্তা প্রোটিনের চাহিদা এবং কৃষি খাতে আধুনিকায়নের ফলে এই অঞ্চলে এখন বিশ্বের মোট ডিম উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়। তবে উৎপাদনের এই সাফল্যের আড়ালে প্রাণিকল্যাণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে ডিমের চাহিদা
ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে ডিমের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতে ডিমের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।
এই চাহিদা পূরণে ছোট খামার ও বাড়ির উঠোনভিত্তিক উৎপাদনের পরিবর্তে বড় শিল্পখামারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রাণিকল্যাণের প্রশ্নও সামনে এসেছে।
খাঁচাবন্দি মুরগির জীবন
বর্তমানে এশিয়ার বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ডিম উৎপাদনকারী মুরগি ছোট খাঁচায় বন্দি অবস্থায় পালন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি মুরগির জন্য বরাদ্দ জায়গা এতটাই কম যে সে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা পর্যন্ত করতে পারে না।
প্রাণী অধিকারকর্মীরা বলছেন, এই পদ্ধতি মুরগির স্বাভাবিক আচরণ ও জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে এমন খাঁচা ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু এশিয়ায় এখনও বিপুল সংখ্যক মুরগি এই ব্যবস্থার মধ্যেই পালন করা হচ্ছে।
কেন পরিবর্তন কঠিন
খাঁচামুক্ত খামার পরিচালনা করতে বেশি জমি ও অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক ভোক্তা বেশি দাম দিয়ে ডিম কিনতে আগ্রহী নন।
একই সঙ্গে অনেক সরকার খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাদের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম সরবরাহ নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন উদ্যোগের সন্ধান
এই পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প পথ খুঁজছে। বিভিন্ন দেশে এমন উদ্যোগ শুরু হয়েছে যেখানে ক্রেতারা খাঁচামুক্ত ডিম কিনতে না পারলেও অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে এমন প্রকল্পে অংশ নিতে পারেন, যা খামারগুলোকে ধীরে ধীরে খাঁচামুক্ত ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সহায়তা করে।
ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এমন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি প্রাণিকল্যাণ উন্নয়নের একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে।
প্রযুক্তি কি সমাধান দেবে?
ডিম শিল্পে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। এমন কিছু প্রযুক্তি উন্নয়ন করা হয়েছে যা ডিম ফোটার আগেই ভ্রূণের লিঙ্গ শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে জন্মের পর পুরুষ বাচ্চা মুরগি ধ্বংস করার প্রচলিত প্রথা কমানো সম্ভব হতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং প্রাণিকল্যাণে এর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্পের উত্থান
ডিম উৎপাদনের আরও একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যপণ্য। খাদ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পণ্য তৈরি করছে যা দেখতে ও ব্যবহারে ডিমের মতো হলেও প্রাণী থেকে আসে না।
যদিও এই বাজার এখনও ছোট, তবে পরিবেশ ও প্রাণিকল্যাণ নিয়ে সচেতন ভোক্তাদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে।
এশিয়ার ডিম শিল্প এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা ও সাশ্রয়ী পুষ্টির চাহিদা, অন্যদিকে প্রাণিকল্যাণের প্রশ্ন। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং ভোক্তাদের পছন্দ—এই তিনের সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে শিল্পটি কোন পথে এগোবে।
ডিমের বাড়তি চাহিদা মেটাতে এশিয়ায় শিল্পখামার বাড়ছে। তবে খাঁচাবন্দি মুরগির জীবন নিয়ে প্রাণিকল্যাণকর্মীদের উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















