একসময় এতটাই বিরল হয়ে পড়েছিল যে তাদের দেখা পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কয়েক দশকের ধৈর্যশীল সংরক্ষণ প্রচেষ্টা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের যত্নে আজ সেই সোনালি বানর আবারও ফিরেছে নিজেদের অরণ্যে। চীনের শেননংজিয়া অঞ্চলের সোনালি নাকওয়ালা বানরের এই প্রত্যাবর্তন এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এক অনন্য সাফল্যের গল্প।
সম্প্রতি শেননংজিয়ার বনভূমিতে দেখা গেছে বেইকে নামের এক পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বানরকে। পরিবারপ্রধানের নেতৃত্বের লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পর সে এখন নিজের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বনরক্ষকদের সঙ্গে তার পরিচিত সম্পর্কও গবেষকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। খাবারের আশায় সে কখনও হাত টেনে ধরে, কখনও আবার মজার ছলে যোগাযোগের চেষ্টা করে।
চার দশকের দীর্ঘ সংগ্রাম
বর্তমানে শেননংজিয়ার সোনালি নাকওয়ালা বানরের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১৮টিতে। তারা ১১টি দলে বিভক্ত হয়ে বিস্তৃত বনাঞ্চলে বিচরণ করছে। অথচ আশির দশকে এই বিরল উপপ্রজাতির সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ৫০১টিতে। তাদের আবাসস্থলও সংকুচিত হয়ে পড়েছিল উদ্বেগজনকভাবে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয় এবং ধীরে ধীরে শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম। এর ফলে প্রাণীগুলোর আবাসস্থল রক্ষা, খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং প্রজনন পরিবেশ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
গবেষণার মাধ্যমে জানা গেল সংকটের কারণ
গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বানরগুলোর আচরণ, খাদ্যাভ্যাস এবং সামাজিক জীবন পর্যবেক্ষণ করেছেন। এক পর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন, শীতকালে খাদ্যের ঘাটতিই ছিল এই প্রাণীদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি।
প্রথমদিকে গাছে ফল ও বাদাম রেখে খাদ্য সহায়তার চেষ্টা করা হলেও বানরগুলো তা গ্রহণ করতে ভয় পেত। পরে একটি সাহসী পুরুষ বানর প্রথমবার সেই খাবার খাওয়ার পর অন্যরাও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে গবেষকেরা তাদের জীবনযাপন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।
কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই
এই বানরগুলো সাধারণত উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে, যেখানে খাদ্য ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য তুলনামূলক কম। তাদের খাদ্যের বড় অংশ আসে গাছের ছাল ও শৈবাল থেকে। পাশাপাশি পাখির ডিম, পোকামাকড় এবং মাটির কিছু উপাদান থেকেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি সংগ্রহ করে।
শীতকালে খাদ্যসংকট দেখা দিলে তাদের শরীরের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং লোমের উজ্জ্বলতাও কমে যায়। তবে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে তাদের বিখ্যাত সোনালি রং আবারও ফিরে আসে।
প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংরক্ষণ
সংরক্ষণ কার্যক্রমে মানুষের হস্তক্ষেপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র চরম খাদ্যসংকটের সময় সামান্য সহায়তা দেওয়া হয়। মূল লক্ষ্য হলো প্রাণীগুলোকে তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ দেওয়া।
এ জন্য বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলকে সংযুক্ত করতে একাধিক পরিবেশগত করিডর তৈরি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমিও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, যাতে বানরগুলোর চলাচল ও প্রজননের সুযোগ বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। অনেক পরিবারকে বিকল্প জীবিকার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবস্থার মাধ্যমে বনাঞ্চলের ওপর মানুষের চাপ কমানো হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রেও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যা পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি প্রাণীদের আবাসস্থলে মানুষের উপস্থিতির প্রভাব কমিয়েছে।
আশার প্রতীক হয়ে ওঠা এক প্রাণী
একসময় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা এই বিরল সোনালি বানর আজ আবারও শক্তভাবে টিকে আছে। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি শুধু একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার গল্প নয়, বরং এটি দেখিয়ে দেয় যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের আন্তরিক প্রচেষ্টা মিললে বিপন্ন প্রজাতিকেও নতুন জীবন দেওয়া সম্ভব।
সোনালি নাকওয়ালা বানরের এই সাফল্য এখন বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















