যুদ্ধ, অবকাঠামো ধ্বংস এবং চিকিৎসক সংকটের দীর্ঘ ছায়ার মধ্যে ইয়েমেনে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইউএসটি)। সারাক্ষণ রিপোর্ট।
ইয়েমেনের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটি দেশটির স্বাস্থ্যখাতের সংকট মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স ও দন্তচিকিৎসক তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আল-মাওয়ারিদ ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি ২০২৫ সালে ৮ মিলিয়ন ডলারের একটি ইসলামিক ফাইন্যান্স সুবিধা পেয়েছে। এই অর্থ দিয়ে একটি ২৫০ শয্যার আধুনিক শিক্ষণ হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে, যেখানে থাকবে অত্যাধুনিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি।
সংঘাতের মধ্যেও এগিয়ে চলা
ইউএসটির সভাপতি ড. হামিদ আকলান ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হন। শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসা শিক্ষাকে দেশের সব মানুষের নাগালে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে নারী এবং দূরবর্তী অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি ছিল তাঁর অগ্রাধিকার।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এছাড়া অনলাইন শিক্ষাক্রমে রয়েছে আরও ৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলমান সংঘাতের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে রাজধানী সানার প্রধান ক্যাম্পাস ও শিক্ষণ হাসপাতালসহ বিভিন্ন কার্যক্রম স্থানান্তর করতে হয়। ২০২০ সালে ইউএসটির প্রধান কার্যালয় এডেনে সরিয়ে নেওয়া হয়।
নতুন হাসপাতাল, নতুন সম্ভাবনা
২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নতুন হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। হাসপাতাল চালু হলে প্রতি বছর ১২০ থেকে ১৫০ জন নতুন চিকিৎসক প্রশিক্ষণ পাবেন। এটি দেশজুড়ে নতুন প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের মোট সংখ্যার প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রকল্পটি সরাসরি ৮৫০টিরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৪ হাজার ৬০০টি চাকরির সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালের সম্প্রসারিত সেবা এবং মোবাইল স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
চিকিৎসক সংকটের গভীরতা
ইয়েমেনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংঘাতের আগেও দুর্বল ছিল। বছরের পর বছর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং চিকিৎসা অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মেডিকেল কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও প্রশিক্ষক দেশ ছেড়ে চলে গেছেন।
বর্তমানে ইয়েমেনে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ০.১। যেখানে আঞ্চলিক গড় ১.১ এবং বৈশ্বিক গড় ১.৯। দেশটির মোট ৪ কোটি ৫ লাখ মানুষের মধ্যে ২ কোটিরও বেশি মানুষ এখনও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে রয়েছে।

নারী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব
ইউএসটির দূরশিক্ষা কার্যক্রম বিশেষভাবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবারগত দায়িত্ব, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং যাতায়াতের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নারী সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না।
ইয়েমেনের সামাজিক বাস্তবতায় নারী রোগীদের জন্য নারী চিকিৎসকের প্রয়োজনও অত্যন্ত বেশি। তাই চিকিৎসা শিক্ষায় নারী-পুরুষের ভারসাম্য নিশ্চিত করা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ড. আকলান। তাঁর মতে, নারীদের শিক্ষার বিকল্প নেই এবং দেশের উন্নয়নের জন্য নারী শিক্ষাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের সমন্বয়
নতুন হাসপাতালটি শুধু চিকিৎসা সেবাই দেবে না, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠবে। হাসপাতালের নকশা, নিরাপত্তা, সেবার মান এবং পরিচালন দক্ষতা উন্নয়নে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি সংযুক্ত হাইব্রিড জ্বালানি ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে, যা জ্বালানি ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে।
ইউএসটি কর্তৃপক্ষের আশা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি এবং সম্প্রসারিত স্বাস্থ্যসেবা একত্রে ইয়েমেনের স্বাস্থ্যখাত পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং আগামী প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে।
ইয়েমেনে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে নতুন শিক্ষণ হাসপাতাল ও চিকিৎসক তৈরির উদ্যোগ স্বাস্থ্যসেবায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















