বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১০ এপ্রিল এক অবিস্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনেই স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ প্রথমবারের মতো সুসংগঠিত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তি পায়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, পরবর্তী সময়ের মুজিবনগরে, এই সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হলেও রাষ্ট্রগঠনের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ১০ এপ্রিলেই। একই সঙ্গে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্পষ্টভাবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন ও নিশ্চিত করা হয়, আর ১৭ এপ্রিল সেই ঘোষণাপত্র জনসমক্ষে পাঠ করা হয়।

তাই ১০ এপ্রিল কেবল সরকার গঠনের দিন নয়, এটি এমন এক দিন, যেদিন বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম রাষ্ট্রীয় বৈধতা লাভ করে। ২৫ মার্চের গণহত্যা, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা, সশস্ত্র প্রতিরোধ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত এবং অস্থায়ী সরকার গঠন—এই পুরো ধারাবাহিকতার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দিন ১০ এপ্রিল। এই দিনটিকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় সেই দীর্ঘ পথের দিকে, যে পথে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বৈষম্য, দমননীতি ও রাজনৈতিক প্রতারণার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ দ্রুত বুঝতে শুরু করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও তারা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত অংশীদার নয়। অর্থনীতি থেকে প্রশাসন, সামরিক কাঠামো থেকে ভাষানীতি—সবখানেই পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্য স্পষ্ট ছিল। পূর্ব বাংলার শ্রম, উৎপাদন ও বৈদেশিক মুদ্রা রাষ্ট্রকে সচল রাখলেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্যের হাতে। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক ছিল না; এটি ছিল আত্মমর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করার এক অব্যাহত প্রক্রিয়া। সেই ক্ষোভ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, আর সেই চেতনাকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেয় আওয়ামী লীগ।
![এপ্রিল মাস ১৯৭১, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দিবস ভিত্তিক ঘটনাপ্রবাহ - History GLive [ ইতিহাস জিলাইভ ] truth alone triumphs](https://history.glive24.com/wp-content/uploads/2022/07/006.jpeg)
ভাষা আন্দোলন এই পথের প্রথম বড় মাইলফলক। বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্ন দ্রুতই বাঙালির রাজনৈতিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়। এরপর শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং স্বাধিকারের দাবিতে জনসম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় ছয় দফা বাঙালির সামনে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো হাজির করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তখন কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং বাঙালির অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রধান রাজনৈতিক বাহকে পরিণত হয়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন ছিল সেই দীর্ঘ সংগ্রামের গণরায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় বিপুল জনসমর্থন পায় এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তি অর্জন করে। পরবর্তী রাষ্ট্রীয় বৈধতার ভিত্তি দাঁড়িয়েছিল ঠিক সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই রায় মানেনি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে তারা গণতান্ত্রিক পথ বন্ধ করে দেয়।

এরপর শুরু হয় ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল অধ্যায়। ১ মার্চের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ পূর্ব বাংলা জুড়ে ফেটে পড়ে বিক্ষোভ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কার্যত পূর্ব বাংলার প্রশাসন তখন কেন্দ্রীয় পাকিস্তানি শাসনের হাতছাড়া হয়ে যায়। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতিকে যে দিকনির্দেশনা দেন, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রস্তুতির কেন্দ্রীয় মুহূর্ত। সেখানে তিনি সরাসরি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জনগণের প্রতিরোধশক্তির সঙ্গে যুক্ত করেন। মার্চজুড়ে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জনগণের ঐক্য এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা ভেঙে পড়তে শুরু করে।
এই পরিস্থিতির জবাবে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে বর্বর সামরিক অভিযান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ লাইন, ইপিআর সদর দপ্তর, আবাসিক এলাকা—সবখানেই চলে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। এই গণহত্যার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, পাকিস্তানি রাষ্ট্র আর বাঙালির গণরায়কে মানবে না; বরং শক্তি প্রয়োগে তাদের দমন করবে। কিন্তু দমনই শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রামকে অপরিবর্তনীয় করে তোলে। ২৫ মার্চের সেই কালরাত বাঙালিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়—এবার স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণেই আসে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশের মানুষকে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এই ঘোষণাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনামুহূর্তের রাজনৈতিক ঘোষণা। পরে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাষায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ ২৬ মার্চের ঘোষণাটি ছিল স্বাধীনতার তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘোষণা, আর ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্র সেই ঘোষণাকে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়।
এই জায়গাটিই ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় ২৬ মার্চের ঘোষণা এবং ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্রকে গুলিয়ে ফেলা হয়। বাস্তবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সূচনামুহূর্তের রাজনৈতিক ঘোষণা। আর ১০ এপ্রিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঘোষণাপত্র ছিল সেই ঘোষণার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন, রাষ্ট্রীয় বৈধতা এবং সরকার গঠনের আইনি দলিল। পরে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। সুতরাং ১৭ এপ্রিলের পাঠ করা ঘোষণাপত্রে ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে শুধু স্মরণই করা হয়নি, সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন ও কার্যকর ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে আরও একটি মৌলিক বিষয় বলা হয়: বাংলাদেশের স্বাধীনতা ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক ধারাবাহিকতা নির্ধারিত হয়। একই দলিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে, আর তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে যুদ্ধরত জাতি একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব পায়। সেই নেতৃত্বের অধীনে কূটনীতি, প্রশাসন, সামরিক সমন্বয়, শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক সংগঠন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এখানেই ১০ এপ্রিলের মাহাত্ম্য সবচেয়ে গভীর। যুদ্ধ চলছিল, মানুষ লড়ছিল, প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল—কিন্তু রাষ্ট্রের বৈধ কাঠামো ছাড়া সেই সংগ্রাম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পূর্ণ শক্তি পেত না। একটি স্বাধীনতার যুদ্ধকে শুধু অস্ত্রের লড়াই হিসেবে নয়, বৈধ রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে দরকার ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুমোদন, রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং একটি সাংবিধানিক দলিল। ১০ এপ্রিল সেই সবকিছুর সমন্বিত রূপ। তাই এদিনের গুরুত্ব কেবল আবেগের নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দিক থেকেও অসাধারণ।
১৭ এপ্রিলের শপথ ছিল ১০ এপ্রিলের সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য ও প্রতীকী পরিণতি। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা, পরে মুজিবনগর, সেই কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের স্মৃতিতে এক অনন্য স্থান। সেখানে বিশ্বকে জানানো হয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ নয়; এটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনুমোদিত রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম। যুদ্ধের মধ্যে দাঁড়িয়ে এটি ছিল অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ।

এই পুরো ইতিহাসের কেন্দ্রে ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, কিন্তু সেই নেতৃত্বের শক্তি এসেছিল জনগণের কাছ থেকে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান, নির্বাচন, অসহযোগ—প্রতিটি ধাপে জনতার অংশগ্রহণ আওয়ামী লীগকে বাঙালির জাতীয় আন্দোলনের প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। শেখ মুজিবুর রহমান সেই আকাঙ্ক্ষার মুখপাত্র, আর তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অন্য নেতারা যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রগঠনের বাস্তব রূপদাতা। ফলে ১০ এপ্রিলের ইতিহাস কেবল একটি সরকারের ইতিহাস নয়; এটি দল, নেতৃত্ব, ভোটের বৈধতা, গণআকাঙ্ক্ষা এবং রক্তঝরা সংগ্রামের সম্মিলিত ইতিহাস।
আরও একটি সত্য না বললেই নয়। ১০ এপ্রিলের সরকার কোনো নিরাপদ প্রাসাদে জন্ম নেয়নি। এর ভিত্তি ছিল পোড়া জনপদ, শরণার্থীর মিছিল, সীমান্তপাড়ি দেওয়া মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত পরিবার, গেরিলা প্রতিরোধ এবং গণহত্যার ছাই। সেই অর্থে ১০ এপ্রিল ছিল জনগণের ত্যাগকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার দিন। এই সরকার জন্ম নিয়েছিল নামহীন মানুষের রক্ত, কান্না, আশা ও অদম্য প্রতিরোধের ভিতের ওপর।
আজ ১০ এপ্রিল ফিরে দেখলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ে সীমাবদ্ধ নয়; তার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত নির্মিত হয়েছে তারও আগে। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বাঙালির মুক্তির পথকে স্পষ্ট করে। ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্র সেই ঘোষণাকে অনুমোদন করে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেয়। ১৭ এপ্রিল সেই দলিল জনসমক্ষে পাঠের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে এক যুদ্ধরত রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এই তিনটি তারিখ তাই একই ইতিহাসের তিনটি অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ।

স্মরণে ১০ এপ্রিল মানে কেবল অতীতের একটি দিনকে শ্রদ্ধা জানানো নয়। এর মানে হলো মনে রাখা, স্বাধীনতা হঠাৎ করে এসে পড়েনি। এটি এসেছে গণরায়, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ, সংগঠন এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রচিন্তার সম্মিলনে। সেই কারণেই ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক আলোকোজ্জ্বল রাজনৈতিক দিন—যে দিনে যুদ্ধরত বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের বৈধ কাঠামো লাভ করেছিল।
অনিন্দ্য ইসলাম 



















