জলবায়ু পরিবর্তন এখন ভারতে একটি বড় জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে। নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি রোগের ধরণ বদলে দিচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ জেলাকে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
ডাসরা নামের একটি সংস্থার প্রকাশিত ‘আন্ডার দ্য ওয়েদার: ইন্ডিয়ার ক্লাইমেট-হেলথ ইন্টারসেকশনস অ্যান্ড পাথওয়েজ টু রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এগুলো একটি ধারাবাহিক সংকটের অংশ, যা মানুষের স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
রোগের ধরনে বড় পরিবর্তন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে এবং এর প্রভাবও তীব্র হচ্ছে। বন্যার কারণে কলেরা ও হেপাটাইটিসের মতো পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে তাপপ্রবাহ ডিহাইড্রেশন, হিটস্ট্রোক এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগ ছড়ানোর ধরণও বদলাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের ফলে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো বাহকবাহিত রোগ নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আগে যেখানে এসব রোগ দেখা যেত না, যেমন শিমলা, জম্মু-কাশ্মীরের কিছু এলাকা ও হিমালয় পাদদেশ—সেখানেও এখন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। পুনে শহরকে ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেখানে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া জলবায়ু চাপের সঙ্গে অসংক্রামক রোগের সম্পর্কও বাড়ছে। অতিরিক্ত গরম হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, আর বায়ুদূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণ হচ্ছে। প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর বহুগুণক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অসম প্রভাব
এই প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে না। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব গোষ্ঠী জলবায়ুজনিত ধাক্কা মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম, ফলে বৈষম্য আরও বাড়ছে।
তীব্র গরমের কারণে শ্রমিকদের কাজের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ২০২১ সালে গরমের কারণে ভারতে প্রায় ১৬০ বিলিয়ন শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী ও শিশুদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। তাপপ্রবাহের সময় অতিরিক্ত গরমে আগাম প্রসবের সম্ভাবনা প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়ে যায়, এবং তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
বায়ুদূষণ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার মতো জটিলতা বাড়ায়। শিশুদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দুর্বল হওয়ায় তারা সহজেই হিটস্ট্রেস, পানিশূন্যতা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে কম ওজন নিয়ে জন্ম, অ্যাজমা এবং ফুসফুসের সক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্ন
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত করে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং ওষুধ ও টিকার সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকায় সামান্য বিঘ্নও মানুষের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবিকা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, আয় কমে যাওয়া এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস—সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য এক ধরনের দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে।

গৃহীত পদক্ষেপ
চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সম্পর্ক মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গত এক দশকে ভারতে জলবায়ু নীতিতে স্বাস্থ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
হিট অ্যাকশন প্ল্যানের মতো উদ্যোগ, যেখানে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা থাকে, তা বিভিন্ন শহর ও জেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ মানুষকে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করছে।
আগামীর চ্যালেঞ্জ
তবে এখনও বেশ কিছু বড় সমস্যা রয়ে গেছে। জলবায়ু ও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত স্থানীয় তথ্যের অভাব থাকায় লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হচ্ছে। অভিযোজনের জন্য অর্থায়ন সীমিত এবং তা অনেক ক্ষেত্রে অসমভাবে বণ্টিত। পাশাপাশি জনসচেতনতার অভাব ও দুর্বল তথ্যব্যবস্থাও কার্যকর উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় তথ্যব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু নীতির কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকে স্থান দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















