০৯:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
চার রাজ্য, চার মুখ্যমন্ত্রী—২০২৬ সালের নির্বাচনে ‘মুখ’ই শেষ কথা মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ ও মালদায় ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক নাম বাদ রাশিয়ায় নোবেলজয়ী মানবাধিকার সংগঠন ‘মেমোরিয়াল’কে ‘চরমপন্থী’ ঘোষণা “চাবিটি হারিয়ে গেছে” হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ: যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি কৌশলগত চাপ ইরান যুদ্ধের ধাক্কা: সামনে আরও বাড়তে পারে তেলের দাম পোপাইসের বেইজিংয়ে প্রত্যাবর্তন, ২৪ বছর পর নতুন করে চীনা বাজারে জোরালো উপস্থিতি ট্রাম্পের ‘আনুগত্য পরীক্ষা’ কি ন্যাটোর ঐক্যে ফাটল ধরাচ্ছে? কুষ্টিয়ার স্কুলে অচেতন অবস্থায় ছাত্রী উদ্ধার, যৌন নির্যাতনের আশঙ্কা শি–চেং বৈঠকে নতুন সমীকরণ, তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা কমার ইঙ্গিত

পারস্য উপসাগরে বদলে যাওয়া শক্তির সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধের ভাষা হঠাৎ করেই কূটনীতির ভাষায় বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র হুমকির পর ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। পরে ইসরায়েলও এতে যোগ দেওয়ার কথা জানায়। এই সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার কথা রয়েছে, যেখানে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই বিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। পরিস্থিতি এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাহাজ চলাচল, তেল রপ্তানি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তেহরানের প্রভাব বাড়ছে, আর আরব রাজতন্ত্রগুলোও নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি হলে কী হতে পারে

যদি এই যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর্যন্ত টিকে যায়, তাহলে আরব দেশগুলোর প্রথম কাজ হবে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। তাদের লক্ষ্য হবে তুলনামূলক সস্তা, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করা, যাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো যায়। ইসরায়েলও একইভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার পুনর্গঠনে মন দেবে।

দ্বিতীয় বড় অগ্রাধিকার হবে বিকল্প সরবরাহপথ তৈরি করা। লোহিত সাগরের দিকে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, উপসাগরনির্ভর বাণিজ্যের বদলে অন্য সমুদ্রপথ খোঁজা—এসব পরিকল্পনার পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটাই: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চাপ কমানো। কিন্তু এখানেও বড় সীমাবদ্ধতা আছে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত বা ইরাকের মতো দেশগুলো যদি আরব উপদ্বীপের স্থলপথে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তারা আবার সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর সঙ্গে থাকবে ট্রানজিট ফি-র বাড়তি বোঝা।

ভৌগোলিক বাস্তবতা আরব দেশগুলোর জন্য বড় দুর্বলতা। উপসাগরের বিস্তীর্ণ জলপথ, উপকূলজুড়ে বন্দর, শিল্পকারখানা, লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র, তেল সংরক্ষণাগার, তথ্যকেন্দ্র, হোটেল ও সুউচ্চ ভবন—সবই ইরানের হামলার আওতায়। এই পুরো অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখা প্রায় অসম্ভব। ফলে আপাতত আরব দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে নিরাপদ চলাচলের জন্য অর্থ পরিশোধ করা।

Forty years wind wave power assessment in the high-energy region of Persian  Gulf | International Journal of Environmental Science and Technology |  Springer Nature Link

এই নতুন বাস্তবতায় নিরাপত্তা কারা দিচ্ছে, সেটা হয়তো তাদের কাছে প্রধান বিষয় নয়। আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ভরসা করত, এখন হয়তো ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথেই এগোবে। সুপারট্যাঙ্কারপ্রতি কয়েক মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা খরচ তেলের মোট মূল্যের তুলনায় খুব বেশি নয়, আর শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ও গন্তব্যের ক্রেতাদের ঘাড়েই গিয়ে পড়ে।

এই অবস্থাকে অনেকে এমন এক আঞ্চলিক শক্তি-পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন এক কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বরং বেশি মানানসই। এখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য নিজেদের পুরোনো প্রভাব পুনর্গঠন করা হবে দীর্ঘ ও কঠিন কাজ।

আবার যুদ্ধ শুরু হলে সামনে কী ঝুঁকি

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর সংঘাত আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ইরানি প্রতিনিধিদলের ওপর নতুন হামলা হলে এই বিরতি সময়ের আগেই ভেঙে পড়তে পারে। তবু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পূর্ণমাত্রার নতুন যুদ্ধে যাওয়ার পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে বড় কৌশলগত বাধা রয়েছে।

প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে স্পষ্টভাবে পরাজিত করার সহজ পথ তাদের হাতে নেই। পারমাণবিক যুদ্ধের চরম ঝুঁকি বাদ দিলে সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে।

প্রথম পথ হলো ব্যাপক কৌশলগত বোমাবর্ষণ, যার উদ্দেশ্য হবে ইরানের সামরিক ও শিল্পভিত্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু এর জন্য মার্কিন কৌশলগত বোমারু বিমানকে সরাসরি ইরানের আকাশসীমার ভেতরে ঝুঁকি নিতে হবে। ইসফাহানসংলগ্ন ঘটনার পর এ ধরনের অভিযান যে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় আকারের বোমারু বিমান আধুনিক যুদ্ধবিমানের চেয়েও বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুদ্ধের মধ্যেও টিকে আছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা পুনর্গঠিত ও সক্রিয় হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ড্রোন অবকাঠামোও পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। ফলে বড় আকারের হামলা চালানো হলে তার জবাবে তেলসমৃদ্ধ আরব রাজতন্ত্রগুলোর ওপরও বড় আঘাত আসতে পারে। এতে বৈশ্বিক তেলবাজারে নতুন ধাক্কা লাগবে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে, এমনকি বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।

ইসরায়েলও এই ঝুঁকি থেকে বাইরে নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের হামলার সাফল্যের হারও বেড়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ লম্বা হলে ইসরায়েলকে নিজের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও আরও বেশি নিতে হবে।

দ্বিতীয় পথ হতে পারে স্থল বা উপকূলভিত্তিক বড় সামরিক অভিযান, যেমন ইরানের উপকূল বা তার নিয়ন্ত্রিত দ্বীপগুলোর দিকে আক্রমণ। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে আকাশযুদ্ধের সব ঝুঁকি, তার সঙ্গে আরও বেশি হতাহতের আশঙ্কা। অথচ এর বাস্তব লাভ খুবই সীমিত। ছোট আকারের উভচর অভিযান দিয়ে কৌশলগত পরিবর্তন আনা কঠিন, আর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালিয়ে শাসনব্যবস্থা বদলে ফেলা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।

এতে এই নয় যে নতুন সংঘাত হবে না। বরং অর্থ দাঁড়ায়, যুদ্ধ বাড়ানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইরানের সামরিক সহনশীলতা, পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এখন আরও স্পষ্ট।

Mapping Kinetic Energy Hotspots in the Persian Gulf and Oman Sea Using  Surface Current Derived by Geodetic Observations and Data Assimilation

বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার তা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পদক্ষেপে ব্যাহত হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী হিসেবেই তাদের দেখা হতে পারে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র: নিচু মাত্রার সংঘর্ষ, কিন্তু হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হিসেবে যেটি সামনে আসছে, তা হলো সীমিত মাত্রার সংঘর্ষ অব্যাহত থাকা, কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা। বাস্তবে এই চিত্র ইতিমধ্যেই গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ইরান অভিযোগ করছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন হামলা চালিয়েছে, এবং পাল্টা জবাবের প্রস্তুতির কথাও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যদি হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল মোটামুটি চালু থাকে, তাহলে এক ধরনের নতুন স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল মাঝেমধ্যে হামলা চালাবে, অথবা ইরান দাবি করবে যে তারা আক্রান্ত হয়েছে। এর জবাবে ইরান এক-দুই দিনের জন্য প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, কিংবা সীমিত পাল্টা হামলাও চালাতে পারে।

কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর এমন পরিস্থিতি হয়তো দৈনন্দিন খবরের অংশ হয়ে যাবে। উত্তেজনা থাকবে, ঝুঁকিও থাকবে, কিন্তু তেল ও অন্যান্য পণ্য যদি পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে যেতে থাকে, তাহলে বিশ্বের অনেক দেশই হয়তো এটিকে সহনীয় অস্থিরতা হিসেবেই মেনে নেবে।

নতুন বাস্তবতার কেন্দ্রে কেন ইরান

এই পুরো সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হোক বা না হোক, হরমুজ প্রণালি এবং উপসাগরীয় জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে ইরান যে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় উঠে এসেছে, তা এখন আর অস্বীকার করা কঠিন।

আরব দেশগুলোর সামনে এখন প্রশ্ন—তারা কি নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরি করবে, নাকি বাস্তবতা মেনে ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের পথ নেবে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে প্রশ্ন—তারা কি আরও ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতে যাবে, নাকি সীমিত ক্ষতির মধ্যেই নতুন শক্তির সমীকরণ মেনে নিতে বাধ্য হবে?

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নির্ভর করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চার রাজ্য, চার মুখ্যমন্ত্রী—২০২৬ সালের নির্বাচনে ‘মুখ’ই শেষ কথা

পারস্য উপসাগরে বদলে যাওয়া শক্তির সমীকরণ

০৭:৪৮:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধের ভাষা হঠাৎ করেই কূটনীতির ভাষায় বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র হুমকির পর ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। পরে ইসরায়েলও এতে যোগ দেওয়ার কথা জানায়। এই সময়ের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনার কথা রয়েছে, যেখানে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই বিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি বয়ে আনবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। পরিস্থিতি এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রভাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাহাজ চলাচল, তেল রপ্তানি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই তেহরানের প্রভাব বাড়ছে, আর আরব রাজতন্ত্রগুলোও নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি হলে কী হতে পারে

যদি এই যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর্যন্ত টিকে যায়, তাহলে আরব দেশগুলোর প্রথম কাজ হবে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা। তাদের লক্ষ্য হবে তুলনামূলক সস্তা, দ্রুত উৎপাদনযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহ করা, যাতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানো যায়। ইসরায়েলও একইভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা ভাণ্ডার পুনর্গঠনে মন দেবে।

দ্বিতীয় বড় অগ্রাধিকার হবে বিকল্প সরবরাহপথ তৈরি করা। লোহিত সাগরের দিকে নতুন পাইপলাইন নির্মাণ, উপসাগরনির্ভর বাণিজ্যের বদলে অন্য সমুদ্রপথ খোঁজা—এসব পরিকল্পনার পেছনে মূল উদ্দেশ্য একটাই: হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চাপ কমানো। কিন্তু এখানেও বড় সীমাবদ্ধতা আছে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত বা ইরাকের মতো দেশগুলো যদি আরব উপদ্বীপের স্থলপথে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়, তাহলে তারা আবার সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর সঙ্গে থাকবে ট্রানজিট ফি-র বাড়তি বোঝা।

ভৌগোলিক বাস্তবতা আরব দেশগুলোর জন্য বড় দুর্বলতা। উপসাগরের বিস্তীর্ণ জলপথ, উপকূলজুড়ে বন্দর, শিল্পকারখানা, লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র, তেল সংরক্ষণাগার, তথ্যকেন্দ্র, হোটেল ও সুউচ্চ ভবন—সবই ইরানের হামলার আওতায়। এই পুরো অবকাঠামোকে নিরাপদ রাখা প্রায় অসম্ভব। ফলে আপাতত আরব দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে নিরাপদ চলাচলের জন্য অর্থ পরিশোধ করা।

Forty years wind wave power assessment in the high-energy region of Persian  Gulf | International Journal of Environmental Science and Technology |  Springer Nature Link

এই নতুন বাস্তবতায় নিরাপত্তা কারা দিচ্ছে, সেটা হয়তো তাদের কাছে প্রধান বিষয় নয়। আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ভরসা করত, এখন হয়তো ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথেই এগোবে। সুপারট্যাঙ্কারপ্রতি কয়েক মিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা খরচ তেলের মোট মূল্যের তুলনায় খুব বেশি নয়, আর শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ও গন্তব্যের ক্রেতাদের ঘাড়েই গিয়ে পড়ে।

এই অবস্থাকে অনেকে এমন এক আঞ্চলিক শক্তি-পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন এক কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বরং বেশি মানানসই। এখন ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য নিজেদের পুরোনো প্রভাব পুনর্গঠন করা হবে দীর্ঘ ও কঠিন কাজ।

আবার যুদ্ধ শুরু হলে সামনে কী ঝুঁকি

যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার পর সংঘাত আবার শুরু হওয়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ইরানি প্রতিনিধিদলের ওপর নতুন হামলা হলে এই বিরতি সময়ের আগেই ভেঙে পড়তে পারে। তবু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পূর্ণমাত্রার নতুন যুদ্ধে যাওয়ার পথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে বড় কৌশলগত বাধা রয়েছে।

প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে স্পষ্টভাবে পরাজিত করার সহজ পথ তাদের হাতে নেই। পারমাণবিক যুদ্ধের চরম ঝুঁকি বাদ দিলে সামনে মূলত দুটি পথ খোলা থাকে।

প্রথম পথ হলো ব্যাপক কৌশলগত বোমাবর্ষণ, যার উদ্দেশ্য হবে ইরানের সামরিক ও শিল্পভিত্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু এর জন্য মার্কিন কৌশলগত বোমারু বিমানকে সরাসরি ইরানের আকাশসীমার ভেতরে ঝুঁকি নিতে হবে। ইসফাহানসংলগ্ন ঘটনার পর এ ধরনের অভিযান যে অত্যন্ত বিপজ্জনক, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় আকারের বোমারু বিমান আধুনিক যুদ্ধবিমানের চেয়েও বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যুদ্ধের মধ্যেও টিকে আছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা পুনর্গঠিত ও সক্রিয় হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ড্রোন অবকাঠামোও পুরোপুরি ধ্বংস করা যায়নি। ফলে বড় আকারের হামলা চালানো হলে তার জবাবে তেলসমৃদ্ধ আরব রাজতন্ত্রগুলোর ওপরও বড় আঘাত আসতে পারে। এতে বৈশ্বিক তেলবাজারে নতুন ধাক্কা লাগবে, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে, এমনকি বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।

ইসরায়েলও এই ঝুঁকি থেকে বাইরে নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের হামলার সাফল্যের হারও বেড়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ লম্বা হলে ইসরায়েলকে নিজের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও আরও বেশি নিতে হবে।

দ্বিতীয় পথ হতে পারে স্থল বা উপকূলভিত্তিক বড় সামরিক অভিযান, যেমন ইরানের উপকূল বা তার নিয়ন্ত্রিত দ্বীপগুলোর দিকে আক্রমণ। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে আকাশযুদ্ধের সব ঝুঁকি, তার সঙ্গে আরও বেশি হতাহতের আশঙ্কা। অথচ এর বাস্তব লাভ খুবই সীমিত। ছোট আকারের উভচর অভিযান দিয়ে কৌশলগত পরিবর্তন আনা কঠিন, আর পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন চালিয়ে শাসনব্যবস্থা বদলে ফেলা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।

এতে এই নয় যে নতুন সংঘাত হবে না। বরং অর্থ দাঁড়ায়, যুদ্ধ বাড়ানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইরানের সামরিক সহনশীলতা, পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা এখন আরও স্পষ্ট।

Mapping Kinetic Energy Hotspots in the Persian Gulf and Oman Sea Using  Surface Current Derived by Geodetic Observations and Data Assimilation

বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার তা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পদক্ষেপে ব্যাহত হয়, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী হিসেবেই তাদের দেখা হতে পারে।

সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র: নিচু মাত্রার সংঘর্ষ, কিন্তু হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা হিসেবে যেটি সামনে আসছে, তা হলো সীমিত মাত্রার সংঘর্ষ অব্যাহত থাকা, কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকা। বাস্তবে এই চিত্র ইতিমধ্যেই গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ইরান অভিযোগ করছে, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন হামলা চালিয়েছে, এবং পাল্টা জবাবের প্রস্তুতির কথাও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যদি হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল মোটামুটি চালু থাকে, তাহলে এক ধরনের নতুন স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল মাঝেমধ্যে হামলা চালাবে, অথবা ইরান দাবি করবে যে তারা আক্রান্ত হয়েছে। এর জবাবে ইরান এক-দুই দিনের জন্য প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, কিংবা সীমিত পাল্টা হামলাও চালাতে পারে।

কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর এমন পরিস্থিতি হয়তো দৈনন্দিন খবরের অংশ হয়ে যাবে। উত্তেজনা থাকবে, ঝুঁকিও থাকবে, কিন্তু তেল ও অন্যান্য পণ্য যদি পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে যেতে থাকে, তাহলে বিশ্বের অনেক দেশই হয়তো এটিকে সহনীয় অস্থিরতা হিসেবেই মেনে নেবে।

নতুন বাস্তবতার কেন্দ্রে কেন ইরান

এই পুরো সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হোক বা না হোক, হরমুজ প্রণালি এবং উপসাগরীয় জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে ইরান যে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় উঠে এসেছে, তা এখন আর অস্বীকার করা কঠিন।

আরব দেশগুলোর সামনে এখন প্রশ্ন—তারা কি নতুন নিরাপত্তা স্থাপত্য তৈরি করবে, নাকি বাস্তবতা মেনে ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের পথ নেবে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামনে প্রশ্ন—তারা কি আরও ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতে যাবে, নাকি সীমিত ক্ষতির মধ্যেই নতুন শক্তির সমীকরণ মেনে নিতে বাধ্য হবে?

মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখন এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই নির্ভর করছে।